দেশে নিরাপদে চলাচল এবং বাধাহীনভাবে বিদেশ যাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মো. সাহাবুদ্দিন। তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে থাকা কোনো দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হবে না, এমন নিশ্চয়তা বিএনপি সরকার দেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে যে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, সেটি তিনি পাবেন বলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিদেশ যাওয়াকে নিরাপদ মনে করছে সরকার
বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের দ্রুত দেশের বাইরে চলে যাওয়াকেই নিরাপদ মনে করছে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত এই সাবেক রাষ্ট্রপতি দেশে রাজনৈতিকভাবে বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে পারেন বলে মনে করছেন বিএনপির নেতারা। তবে তারা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি।
পদত্যাগের পর মো. সাহাবুদ্দিনও দ্রুত বিদেশ যেতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, কিছুটা সুস্থ হলে ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে বিদেশ যাবেন।
সমঝোতার বিষয়ে এড়িয়ে যান মির্জা ফখরুল
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি না জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হবে। এ বিষয়ে দলের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বা বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার বিষয়টি জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতাও আগে থেকেই জানতেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির এক শীর্ষ নেতা টাইমসকে বলেন, তাদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের চাপ ছিল। বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে বিএনপি আর তাকে রাষ্ট্রপতির পদে রাখতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত সম্মানজনক বিদায় দিয়ে তাকে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গুলশানের বাসায় ওঠার প্রস্তুতি
পদত্যাগের পরও ভিভিআইপি প্রটোকল থাকলেও যেকোনো সময় এনসিপিসহ বিভিন্ন সংগঠন তার বাসায় ঝামেলা করতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই বিএনপি তার বিদেশ যাওয়াকে নিরাপদ মনে করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজধানীর গুলশান-১-এর ১২৩ নম্বর সড়কের ৪১ নম্বর হোল্ডিংয়ে গ্রিন ভিলা ভবনের ৫০২ নম্বর ফ্ল্যাট বিদায়ী রাষ্ট্রপতির জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। বঙ্গভবন ছাড়ার পর তিনি সেখানে উঠবেন।
তার সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) সাগর হোসেন টাইমসকে বলেন, রবিবার (২৬ জুলাই) বা সোমবার (২৭ জুলাই) মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন গুলশানের ওই ফ্ল্যাটে উঠবেন। তিনি এখনো বঙ্গভবনে আছেন।
পদত্যাগের কারণ নিয়ে অবস্থান
বিএনপি নেতারা কৌশলগত কারণে পদত্যাগের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে চান না। তাদের অবস্থান, রাষ্ট্রপতি গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কারণেই পদত্যাগ করেছেন।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার ও ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি একজন মানুষ। তিনি অসুস্থতার কারণেই পদত্যাগ করেছেন। এর বাইরে তিনি কোনো কথা বলবেন না।
মো. সাহাবুদ্দিনও পদত্যাগের পর থেকে একই বক্তব্য দিয়ে আসছেন। তিনি বলেছেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।
শনিবার (২৫ জুলাই) আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলা হলে তা যাচাই-বাছাই করা হবে। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের উদ্দেশ্যও খতিয়ে দেখা হবে।
পুরোনো অভিযোগ নিয়ে সরকারের অবস্থান
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি থাকাকালে মো. সাহাবুদ্দিনের নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার ঝামেলা তৈরি করতে চায় না। তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে দুদকে দায়িত্ব পালন, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকা বা এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে সরকার কোনো দায় নিতে চায় না।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) হাইকোর্টে দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০১৭ সালে জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেন এবং পরে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। প্রতিবেদনে এস আলম গ্রুপের ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, শেয়ার জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং অনিয়মিত ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে এবং বুধবার (২৯ জুলাই) শুনানির কথা রয়েছে।
নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তুতি
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। স্পিকার তা গ্রহণ করে সংবিধান অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
শনিবার (২৫ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। একটিতে হাফিজ উদ্দিন আহমদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ এবং অন্যটিতে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
এদিকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে সংসদের অধিবেশন বসবে এবং ৯০ দিনের মধ্যে সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হবে।
পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী।
আরও পড়ুন:








