শুক্রবার

২৪ জুলাই, ২০২৬ ৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের আজই পদত্যাগের সম্ভাবনা প্রবল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬ ০৮:৩২

শেয়ার

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের আজই পদত্যাগের সম্ভাবনা প্রবল
ছবি সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার (২৪ জুলাই) যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, সরকার বা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি, তবে বঙ্গভবন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে তিনি যেকোনো সময় পদত্যাগ করবেন।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, পদত্যাগপত্র প্রস্তুত রয়েছে এবং শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে স্পিকারের কাছে তা জমা দেবেন রাষ্ট্রপতি।

স্পিকারের দেশে প্রত্যাবর্তন

নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই শুক্রবার (২৪ জুলাই) দুপুরে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, স্পিকারের রবিবার (২৬ জুলাই) দেশে ফেরার কথা থাকলেও তা এগিয়ে আনা হয়েছে।

উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনা

রাষ্ট্রপতির শিগগির পদত্যাগ নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষাপটে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হতে পারেন, তা নিয়ে বিএনপির উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বলে জানা গেছে।

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, মির্জা ফখরুল নির্বাচিত হলে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হবেন। দলের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্য এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্যতার কারণে তাঁকেই পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে।

মির্জা ফখরুল ছাড়াও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আব্দুল মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খানের নাম আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। দলের বাইরে থেকে অরাজনৈতিক ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর নামও দলীয় হাইকমান্ডের তালিকায় রয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলের নাম উল্লেখ করে মন্ত্রিপরিষদের একজন সদস্য জানিয়েছেন, আপাতত এই একটি নামই আলোচনায় রয়েছে এবং দলের কাছে বিকল্প কোনো নাম নেই।

রাষ্ট্রপতির প্রতিক্রিয়া

দেশের বাইরে থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত সংবাদ নাকচ করে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বলেছেন, এসব সংবাদের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই এবং এগুলো ভিত্তিহীন গল্পকাহিনি মাত্র।

পদত্যাগের আলোচনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ সম্পর্কে তাঁর কিছুই জানা নেই এবং এ বিষয়ে যা শোনা যাচ্ছে তা সবই গুজব।

সাংবিধানিক প্রক্রিয়া

সংবিধান অনুযায়ী, মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করলে স্পিকার সাময়িকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে অথবা একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদেই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, ফলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন তা রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, তিনি রাজনীতি করেন এবং করে যাবেন। দল বা দেশ বিপর্যয়ে পড়লে তিনি ফের সামনের কাতারে দাঁড়াবেন বলে জানিয়েছেন।

নতুন রাষ্ট্রপতি প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেছেন, এ বিষয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য নেই এবং তিনি কোনো কর্তৃপক্ষও নন। নতুন রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সাংবাদিকদের বলেছেন, রাষ্ট্রপতি চাইলে সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে পারেন এবং স্বাস্থ্যগত বা অন্য যেকোনো কারণে তাঁর সেই সুযোগ রয়েছে, তবে বিষয়টি সম্পর্কে তাঁরা অবগত নন। এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ বা বক্তব্য নেই বলেও জানান তিনি।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ-পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে বলেছেন, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্পিকারের উদ্দেশে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করতে পারেন। তিনি জানান, সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে বা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার সেই দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে তা পূরণের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান রয়েছে বলেও তিনি জানান।

অতীত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নজির

১৯৯১ সালে সংবিধানের ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালুর পর থেকে সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান কার্যকর রয়েছে। তবে এই বিধান চালুর পর মাত্র একবারই একাধিক প্রার্থী থাকায় সংসদে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। ১৯৯১ সালের ওই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাসের বিপরীতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী করেছিল বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে, যাতে আবদুর রহমান বিশ্বাস জয়ী হন। এরপর থেকে প্রতিবারই একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আসছেন। ক্ষমতাসীন বিএনপির সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় এবারও দলটির মনোনীত প্রার্থীর একক প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার কথা রয়েছে।

প্রেক্ষাপট

উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং তাঁর পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর সংসদ ভেঙে দেওয়া ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ রাজনৈতিক পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. সাহাবুদ্দিন। পরে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর দলটি নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে রাষ্ট্রপতি করার সুযোগ পায়।



banner close
banner close