শুক্রবার

২৪ জুলাই, ২০২৬ ৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩

২৪ জুলাই: গুম হওয়া সমন্বয়কদের ফেলে রেখে যায় রাস্তায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬ ০৮:০৭

শেয়ার

২৪ জুলাই: গুম হওয়া সমন্বয়কদের ফেলে রেখে যায় রাস্তায়
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

২৩ জুলাই কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারির পর, বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা শুরু করে স্বৈরাচারী সরকার। টানা পঞ্চম দিনের মতো কারফিউ বহাল থাকলেও কয়েক ঘণ্টার জন্য তা শিথিল করা হয়। তবে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রাখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত

এদিন সারাদেশে আন্দোলনকারী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ৬৪১ জন। ১৭ থেকে ২৪ জুলাই, এই আট দিনে সারাদেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চার হাজার। রাজধানীতে মোট গ্রেপ্তার হয় ১ হাজার ৭৫৮ জন এবং চট্টগ্রামে ৭০৩ জন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

গ্রেপ্তার অভিযান সম্পর্কে তৎকালীন ডিবিপ্রধান ও ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করেই অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

ব্রডব্যান্ড চালু, মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ

পাঁচ দিন পর বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) রাতে পরীক্ষামূলকভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু করে বিটিআরসি। তবে আন্দোলন দমাতে মোবাইল ইন্টারনেট তখনও বন্ধ রাখে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার। এছাড়া, ক্ষতিগ্রস্তের অজুহাতে মেট্রোরেল ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু করা হয়নি।

নিখোঁজ সমন্বয়কদের সন্ধান

এদিকে, পাঁচ দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদের খোঁজ পাওয়া যায়। আসিফ ও আবু বাকের সামাজিক মাধ্যমে জানান, চোখ বাঁধা অবস্থায় তাদের ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল রাস্তায়।

মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ২০১

ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন আরও চারজনের মৃত্যু হয়। ঢাকা মেডিকেলে তিনজন এবং সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন মারা যায়। বিভিন্ন হাসপাতাল, স্বজন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) পর্যন্ত আন্দোলন ও পরবর্তী সংঘাতে নিহতের সংখ্যা কমপক্ষে ২০১ জনে পৌঁছায়।

সীমিত স্বাভাবিকতা ফেরানোর চেষ্টা

কারফিউ শিথিল থাকায় এদিন ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মানুষ সীমিত পরিসরে চলাচলের সুযোগ পায়। অন্যান্য জেলাতেও জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়েক ঘণ্টা কারফিউ শিথিল রাখা হয়। সরকারি অফিস ও ব্যাংক চার ঘণ্টার জন্য খোলে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‍্যাবের টহল অব্যাহত থাকে সারাদেশে।

কারফিউ শিথিলের সুযোগে রাজধানী থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল শুরু হয়। সদরঘাট থেকে বিভিন্ন রুটে লঞ্চ চলাচলও পুনরায় শুরু হয়। তবে মানুষের চলাচল ছিল একেবারেই সীমিত।

কূটনীতিকদের স্থাপনা পরিদর্শন

একই দিন তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মতবিনিময় করেন তার পালিত সাংবাদিকরা। অন্যদিকে সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত মেট্রোরেল, বিটিভি ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সড়ক ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ৪৯টি দেশের কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের সরেজমিনে পরিদর্শন করিয়ে একধরনের নাটক মঞ্চস্থ করে ফ্যাসিস্ট সরকার।

তদন্ত কমিশনের বৈঠক

কোটা আন্দোলনে ১৬ জুলাইয়ের প্রাণহানির ঘটনা তদন্তে এদিন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিশন গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জনগণের কাছে তথ্য আহ্বান এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়।

সহিংসতায় নিহত আটজনের পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে থাকা মরদেহগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। এতে, স্পষ্ট যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করে দেশে।

সরকারের বক্তব্য ও নতুন কর্মসূচি

তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন যেন হাসিনার মতো করেই হুমকি দিয়ে বলেন, দুষ্কৃতকারীরা যেখানেই থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। আর, ফ্যাসিস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, জনমনে স্বস্তি না ফেরা পর্যন্ত কারফিউ বহাল থাকবে। একইসঙ্গে এদিন, নরসিংদী কারাগার থেকে বের হয়ে আসা বন্দিদের মধ্যে ২৯২ জন আত্মসমর্পণ করেন।

এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ ইন্টারনেট চালু, কারফিউ প্রত্যাহারসহ চার দফা দাবিতে দেওয়া আল্টিমেটাম বহাল রাখে। অন্য একটি অংশ শুক্রবার (২৫ জুলাই) দেশব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি ঘোষণা করে।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও পরীক্ষা স্থগিত

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে এদিন প্রতিক্রিয়া জানায় মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। সংস্থাটির মুখপাত্র মেজর জেনারেল প্যাট রাইডার জানান, তারা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

একই দিন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং সরকার যতদিন প্রয়োজন মনে করবে, ততদিন সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করবে।

এদিকে চলমান পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি বৃহস্পতিবার (৩১ জুলাই) পর্যন্ত পিএসসির সব পরীক্ষা, যার মধ্যে ৪৪তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষাও রয়েছে, স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। এভাবেই বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) একদিকে সীমিত স্বাভাবিকতা দেখানোর চেষ্টা, অন্যদিকে গ্রেপ্তার অভিযান, তদন্ত ও আন্দোলনের নতুন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জুলাই আন্দোলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিন পার হয়।



banner close
banner close