বৃহস্পতিবার

২৩ জুলাই, ২০২৬ ৮ শ্রাবণ, ১৪৩৩

জুলাই আন্দোলনে ওয়াসিম আকরামের বীরত্ব

বিবি মরিয়ম চট্টগ্রাম

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬ ২১:২৭

শেয়ার

জুলাই আন্দোলনে ওয়াসিম আকরামের বীরত্ব
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

চলে আসুন ষোলশহর। মাত্র তিনটি শব্দ। এর পেছনে ছিল না কোনো দীর্ঘ রাজনৈতিক ইশতেহার, ছিল না কোনো কৌশলগত ব্যাখ্যা।

(১৬ জুলাই ২০২৪) দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল ছুঁই ছুঁই। দেশজুড়ে চলমান কোটা আন্দোলনে দিকভ্রান্ত চট্টগ্রামের সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট মোহনায় জড়ো করতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ছোট্ট স্ট্যাটাসটি দিয়েছিলেন মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম। কে জানতো, কিবোর্ডে টাইপ করা এই একটি বাক্যই বন্দরনগরীর রাজপথের ইতিহাস চিরতরে বদলে দেবে।

ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়া ও পুলিশি অ্যাকশন

(১৬ জুলাই) সময়টা ছিল চরম উৎকণ্ঠার। বৈষম্য আর অপশাসনের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা ছাত্রসমাজের ওপর তখন দেশব্যাপী স্বৈরাচারী কাঠামোর দমন-পীড়ন চলছে। গুলি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া।

ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর ডাক দিয়েছিলেন ২২ বছর বয়সী এই তরুণ।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার দক্ষিণ মেহেরনামা গ্রামের শফিউল আলম ও জোসনা বেগম দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। পড়তেন ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। যুক্ত ছিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে। কিন্তু দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ক্যাম্পাসে তাঁর বড় গ্রহণযোগ্যতা ছিল, বিপদে শিক্ষার্থীদের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে।

ঐতিহাসিক আহ্বান ও গুলিবর্ষণ

কী ঘটেছিল সেই দিনগুলোতে? কেন ওয়াসিমকে এই ডাক দিতে হলো?

জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন তীব্র হতে শুরু করে, ওয়াসিম তখন রাজপথের নিয়মিত মুখ। আগের দিন, অর্থাৎ (১৫ জুলাই) নিজের ফেসবুক ওয়ালে তিনি স্পষ্ট লিখেছিলেন, লজ্জাবোধ থাকলে পদত্যাগ করে প্রমাণ করুক, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি। একই দিন ছাত্রসমাজকে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বানও জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভেতরে কাজ করছিল এক তীব্র তাড়না। অনুধাবন করেছিলেন, পিছিয়ে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই।

সেই তাড়না থেকেই (১৬ জুলাই) ওই ঐতিহাসিক আহ্বান। তাঁর স্ট্যাটাসটি ছড়িয়ে পড়ার পর, দলে দলে শিক্ষার্থীরা এসে জড়ো হতে শুরু করে ষোলশহর ও মুরাদপুর এলাকায়। কিন্তু, সেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক ভয়ংকর নির্যাতন। পোস্ট দেওয়ার মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে, শান্তিপূর্ণ সেই জমায়েতের ওপর অতর্কিত সশস্ত্র হামলা চালায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের দলীয় সন্ত্রাসীরা। শুরু হয় নির্বিচার গুলিবর্ষণ।

বৃষ্টির মতো ছুটে আসা বুলেটের সামনে বুক পেতে দেন ওয়াসিম। ঘাতকের নির্মম আঘাতে লুটিয়ে পড়েন রাজপথে।

হাসপাতালে নেওয়ার আগেই নিভে যায় এই অকুতোভয় প্রাণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের মাটিতে প্রথম রক্ত ঝরে ওয়াসিমের।

আত্মত্যাগের পর আন্দোলনের মোড় পরিবর্তন

এরপর যেন এক নতুন ইতিহাস জন্ম নেয়। ওয়াসিমের এই আত্মত্যাগ কোনোভাবেই বৃথা যায়নি। একই দিনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আরেক বীর, আবু সাঈদ। চট্টগ্রাম থেকে রংপুর, এই দুই প্রান্তের রক্ত যেন এক বিন্দুতে এসে মেলে। ওয়াসিমের মৃত্যুর খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। শোক পরিণত হয় তীব্র ক্ষোভে। আর এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই, কোটা সংস্কারের আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে। যার চূড়ান্ত পরিণতিতে পতন ঘটে দীর্ঘ পনেরো বছরের স্বৈরাচারী সরকার শেখ হাসিনার।

মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া

ঘটনার পর (১৮ আগস্ট) চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় ২৫০ জনকে আসামি করে প্রথম হত্যা মামলাটি দায়ের করেন নিহতের মা জোছনা বেগম। তবে, জুলাই-আগস্টের অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় মামলাটি পরবর্তীতে স্থানান্তরিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। দীর্ঘ নিখুঁত তদন্ত শেষে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এবং মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলসহ ২২ জন প্রভাবশালী আসামির বিরুদ্ধে আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। বর্তমানে মামলাটির বিচারকাজ চলমান রয়েছে। আর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আশ্বাস দিয়েছেন, শহীদদের রক্ত বিফলে না যাওয়ার।

আমিনুল ইসলাম, চিফ প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

সহযোদ্ধা ও পরিবারের স্মৃতিচারণ

একটি সাধারণ স্ট্যাটাস থেকে শুরু হওয়া সেই জমায়েত আজ পরিণত হয়েছে একটি জাতির মুক্তির দলিলে। রক্তস্নাত এই বিজয়ের পেছনে যে তরুণেরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, মোহাম্মদ ওয়াসিম আকরাম তাঁদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল এক নাম। যিনি শুধু বন্ধুদের ডাকেননি, নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, অন্যায়ের সামনে কিভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়।

মুরাদপুরের এই রাজপথেই বুলেটের আঘাতে নিভে যায় এক লড়াকু প্রাণ। সেই রক্তাক্ত দুপুরের ক্ষত আজও তাড়িয়ে বেড়ায় তার সহযোদ্ধাদের।

শহিদুল ইসলাম আবির, জুলাই যোদ্ধা

ওয়াসিম ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। ক্যাম্পাস রাজনীতির মাঠে যিনি ছিলেন নির্ভীক কণ্ঠস্বর, বন্ধুদের আড্ডায় তিনিই ছিলেন সবচেয়ে প্রাণবন্ত।

মাসুম বিল্লাহ, শহীদ ওয়াসিম আকরামের সহপাঠী

মুরাদপুরের সেই বুলেট শুধু একটি সম্ভাবনাময় প্রাণই কেড়ে নেয়নি, চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে একটি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সব স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার অবলম্বন। দুই বছর ধরে শূন্য ঘরে ছেলের ছবি দেখে দিন কাটে সন্তানহারা এই মায়ের। চান ছেলের হত্যাকারোদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি।

জোছনা বেগম, শহীদ ওয়াসিম আকরামের মা

আর সন্তানহারা বাবার দেখা মেলে কবরস্থানে, যেখানে দিনভর তিনি খুঁজে বেড়ান কলিজার টুকরো সন্তানকে। ছেলের স্বপ্ন ছিল শিক্ষক হওয়ার। কিন্তু, সেই স্বপ্ন পূরণ না হওয়ার আক্ষেপ প্রতিনিয়ত কাঁদিয়ে যাচ্ছে জন্মদাতা পিতাকে।

শহীদ ওয়াসিমের বাবা শফিউল আলম মামলার অগ্রগতি নিয়ে ক্ষোপ প্রকাশ করেন। জুলাইয়ে সকল হত্যার ও আহতদের সঙ্গে জড়িতদের উপযুক্ত শাস্তি দেখার অপেক্ষায় অসহায় এই বাবা।

শফিউল আলম, শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা

রাজনীতির মাঠে যিনি ছিলেন নির্ভীক যোদ্ধা, সেই ওয়াসিম আকরামের এই আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। তার মৃত্যুর পরই মূলত চট্টগ্রামে গণঅভ্যুত্থান আরও তীব্র হয়ে ওঠে, যার চূড়ান্ত পরিণতিতে (৫ আগস্ট) পতন হয় স্বৈরাচার শেখ হাসিনার।



banner close
banner close