বৃহস্পতিবার

২৩ জুলাই, ২০২৬ ৮ শ্রাবণ, ১৪৩৩

২৩ জুলাই: প্রজ্ঞাপনের পরও থামেনি কোটা আন্দোলন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬ ০৭:০৯

শেয়ার

২৩ জুলাই: প্রজ্ঞাপনের পরও থামেনি কোটা আন্দোলন
ছবি সংগৃহীত

কোটা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) প্রশাসনিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে এবং ৭ শতাংশ পদে কোটার বিধান রেখে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর মাধ্যমে সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন করপোরেশনের ৯ম থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে নতুন বিধান কার্যকর হয়।

একই দিন ছিল ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার ষষ্ঠ দিন। তবে রাতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড সংযোগ চালু করা হয়। জরুরি সেবা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং গণমাধ্যমকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই সংযোগ দেওয়া হলেও সাধারণ গ্রাহকদের বড় একটি অংশ তখনও ইন্টারনেট সুবিধার বাইরে ছিল।

কারফিউ শিথিল, আংশিক স্বাভাবিকতা

২৩ জুলাইও সাধারণ ছুটি বহাল থাকে। তবে কারফিউ ধীরে ধীরে শিথিল করায় রাজধানী ও মহাসড়কে সীমিত পরিসরে যান চলাচল শুরু হয়। দীর্ঘ কয়েকদিনের অচলাবস্থার পর জনজীবনে স্বাভাবিকতার আংশিক আভাস দেখা দিতে শুরু করে।

এদিকে, সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের সাজানো মামলায় চিরুনি অভিযান আরও জোরদার করে হাসিনার পালিত বাহিনী। সোমবার (২২ জুলাই) রাত থেকে মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) বিকেল পর্যন্ত সারা দেশে আরও প্রায় ১ হাজার ১০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকাতেই আটক করা হয় অন্তত ৫১৭ জনকে। বুধবার (১৭ জুলাই) থেকে মঙ্গলবার (২৩ জুলাই), এই এক সপ্তাহে গ্রেপ্তারের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যায়। রাজধানীতে এদিন আরও ৩৮টি নতুন মামলা দায়ের করা হয়।

অফিস ও কারখানা চালুর সিদ্ধান্ত

পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ঘোষণা দেয়, বুধবার (২৪ জুলাই) সরকারি ও বেসরকারি অফিস সীমিত পরিসরে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। একই সঙ্গে রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানাও চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

চার দফা দাবিতে অনড় শিক্ষার্থীরা

প্রজ্ঞাপন জারির পরও আন্দোলন পুরোপুরি থামেনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করে সরকারকে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম বহাল রাখা হয়। সমন্বয়করা জানায়, এসব দাবি বাস্তবায়ন হলেই কেবল আলোচনার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

শিক্ষার্থীদের চার দফা দাবির মধ্যে ছিল সম্পূর্ণ ইন্টারনেট চালু করা, কারফিউ প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হল খুলে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং আন্দোলনের সব সমন্বয়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সমন্বয়কদের নিখোঁজের তথ্য

একই দিন সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) থেকে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার ও রিফাত রশীদ নিখোঁজ রয়েছেন। পরে জানা যায়, মূলত আন্দোলন দমাতে গুম করা হয় এসব সমন্বয়কদের।

সরকারের প্রতিক্রিয়া

এদিকে, তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ফাঁকা বুলি ছুড়ে বলেন, আন্দোলনকারী কোনো শিক্ষার্থীকে মামলায় জড়ানো হয়ে থাকলে, সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে সরকার তা যাচাই-বাছাই করে দেখবে।

সংবাদ সম্মেলনে ওই সরকারের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী আন্দোলন দমনের কৌশল হিসেবে বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল খুলে দেওয়া সম্ভব নয়।

এ ছাড়া, র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. হারুন অর রশিদ হাসিনার সুরে সুর মিলিয়ে হুমকি দেন, ছাত্র আন্দোলনের নামে যারা নাশকতা ও সহিংসতায় জড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

নতুন অধ্যায়ে আন্দোলন

সোমবার (১ জুলাই) কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন মঙ্গলবার (১৬ জুলাই)-এর প্রাণহানির পর সহিংস রূপ নেয়। এরপর কারফিউ, সেনা মোতায়েন, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা ও ব্যাপক গ্রেপ্তারের মধ্যেই মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) সরকার নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করলেও, আন্দোলনের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট তখনও কাটেনি। বরং নতুন দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন পৌঁছে যায় পরবর্তী অধ্যায়ে।



banner close
banner close