২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল সত্য, ন্যায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার এক বিপ্লবী জাগরণ। সেই জাগরণের মিছিল, প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর এবং বীরত্বগাঁথা আত্মত্যাগে দীপ্ত হয়ে উঠেছিল সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ওপর ফ্যাসিস্ট হাসিনার জুলুমবাজ বাহিনীর পৈশাচিক দমন-পীড়ন পুরো দেশকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে। উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো। এই দমন-পীড়নের দৃশ্য দেখে সারা দেশের সাধারণ জনগণও জুলাইয়ে রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হয়।
তবে বিপ্লবী সেই জাগরণ যেন ১৮ জুলাই এসে কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। সরকারি ও বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা, ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গণযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলে, সেই রাতেই শিক্ষার্থীরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সরকারের এসব পরোক্ষ বাধায় যখন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থমকে দাঁড়ায়, ঠিক সেই মুহূর্তেই রচিত হয় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এক সংগ্রামী অধ্যায়।
যাত্রাবাড়িতে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু
ধর্মীয় শিক্ষার আলোকবর্তিকা হাতে যখন তারা স্বৈরাচারের অন্যায়কে দৃপ্ত কণ্ঠে রুখে দেয়, তখন রাজধানীর যাত্রাবাড়ি পরিণত হয় আন্দোলনের এক দুর্বার দুর্গে। ইন্টারনেটবিহীন সেই নিস্তব্ধ সময়ে তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্দোলনের অগ্রভাগে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, অটল সাহস আর দৃপ্ত প্রত্যয়ে।
জানা যায়, যাত্রাবাড়ি থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার মাদ্রাসার বিস্তৃতি রয়েছে। সে সময় এই দেড় হাজার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাই পাল্টে দেয় জুলাই আন্দোলনের গতিপথ, পিছু হটতে বাধ্য করে হাসিনার পেটুয়া বাহিনীকে।
দমন-পীড়নের মুখেও প্রতিরোধ
যাত্রাবাড়িতে যখন মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা দুর্ভেদ্য আন্দোলন গড়ে তুলেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করতে তাদের ওপর নেমে আসে হাসিনার পালিত বাহিনীর বর্বরতার কালো মেঘ। সে সময় পুলিশের বারুদের ঝাঁঝ আর টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় ভারী হয়ে উঠেছিল যাত্রাবাড়ির চারপাশ। শিক্ষার্থীদের অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন দমাতে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সেই সন্ত্রাসী বাহিনী যেন এক নির্মম দমনযন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, তারা আন্দোলনে নামলে যাত্রাবাড়ি থানার ছাদ থেকেই তাদের ওপর চালানো হয় মুহুর্মুহু গুলি। একপর্যায়ে ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হলে তাদের টার্গেট করে গুলিবিদ্ধ করা হয়। এতে অনেক শিক্ষার্থী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, কেউ আহত হয়ে হাসপাতালে যায়, আবার কেউ সেখানেই শহীদ হন।
কিন্তু তবুও ভীত হয়নি সেই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। সাহসিকতার মূর্ত প্রতীক হয়ে তারা গড়ে তোলে এক অদম্য প্রতিরোধের প্রাচীর, যেন জীবন্ত ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল স্বৈরাচারের পৈশাচিক বাহিনীর বিপরীতে। প্রতিটি গর্জন, প্রতিটি বিস্ফোরণের মুখে তাদের অবস্থান ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাদের ত্যাগ আর সম্মিলিত প্রতিরোধই আন্দোলনকে এনে দেয় নতুন গতি ও অতুলনীয় শক্তি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা শুধু যাত্রাবাড়িতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; যাত্রাবাড়ির গণ্ডি পেরিয়ে চট্টগ্রাম, ফেনী, বরিশাল এবং ঢাকার সব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তারা গড়ে তোলে জুলাই আন্দোলনের এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর।
আত্মত্যাগ ও অংশগ্রহণ
মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার নিয়ে সরাসরি কোনো চাওয়া-পাওয়া না থাকলেও, কোটা আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং ফ্যাসিস্ট সম্রাজ্ঞী শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী রূপ তাদের নীরব থাকতে দেয়নি। বিবেকের তাড়নায়, প্রতিবাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তারা নেমে আসে জুলাইয়ের রাজপথে। বিসর্জন দেয় বুকের তাজা রক্ত। এতে কমপক্ষে একশো মাদ্রাসা শিক্ষার্থী শহীদ হন। এছাড়া আহত হন ন্যূনতম পাঁচশো।
স্বীকৃতি না পাওয়ার অভিযোগ
কিন্তু সমালোচনা রয়েছে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনে তাদের আত্মত্যাগ, আত্মনিবেদন ও আত্মবলিদান দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শেখ হাসিনা পালানোর পর ফ্যাসিবাদের প্রতীক দূর হলেও ফ্যাসিবাদের উপকরণগুলো থেকে যাওয়ায় মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মূলধারায় আসতে পারেনি। তাদের অনেকে বলছে, তারা যেমন ফ্যাসিবাদের আমলে বঞ্চিত ছিল, ঠিক তেমনই অন্তর্বর্তীকালীন সময়েও বঞ্চিত ছিল এবং বর্তমান সরকারের সময়েও তারা নানা কারণে অবহেলিত।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ি ছিল মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের হটস্পট। এছাড়াও টঙ্গী, উত্তরা, রামপুরা, বাড্ডাসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্পটে তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যায়।
কিন্তু তাদের এই অবদান অনুযায়ী তারা প্রাপ্য স্বীকৃতি পায়নি বলে মনে করে মাদ্রাসাপন্থী বিশ্লেষকরা। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নাহিদ, সারজিস, হাসনাতরা জুলাইয়ের স্টেকহোল্ডার হিসেবে উঠে এলেও, গণঅভ্যুত্থানের গতিপথ পরিবর্তনকারী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। এটিকে তারা কাঠামোগত ভুল বিন্যাস হিসেবে দেখছে।
এছাড়াও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অনেক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর মতে, ইসলামপন্থী ব্যক্তিত্বরা বড় নেতা হওয়ার যোগ্যতা রাখলেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের নেতৃত্বে উঠে আসতে দেওয়া হয় না। সামাজিক বৈষম্যের নানা স্তর তাদের বড় নেতৃত্বে উঠে আসার পথকে বাধাগ্রস্ত করে।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং ছিল ত্যাগ, সাহস ও প্রতিবাদের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। এই অধ্যায়ে যেমন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবদান অনস্বীকার্য, তেমনই মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ, অদম্য প্রতিরোধ ও সাহসিকতাও ইতিহাসে সমানভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, এই বিপুল ত্যাগ ও অবদানের পরও তারা কি তাদের প্রাপ্য স্বীকৃতি ও অবস্থান পেয়েছে, নাকি এখনো তারা মূলধারার বাইরে রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈষম্যবিরোধী এই আন্দোলন তখনই প্রকৃত পূর্ণতা লাভ করবে, যখন এই আন্দোলনের অকুতভয় অগ্রসেনা মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরাও বৈষম্যমুক্ত অধিকার ও স্বীকৃতি অর্জন করবে। তাদের মতে, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের এই আত্মত্যাগ, সাহসিকতা ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ইতিহাসে এই আন্দোলন যতই গৌরবময় হোক না কেন, বাস্তবতার মাটিতে তা অপূর্ণই থেকে যাবে।
আরও পড়ুন:








