রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। এতে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ঘর-গৃহস্থালিতে রান্নাবান্নায় ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও একেবারে গ্যাস মিলছেই না। পাশাপাশি গ্যাসচালিত যানবাহনগুলো নিয়েও চরম দুর্ভোগের শিকার মালিক-চালকরা। খোদ রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করেও নিম্নচাপের কারণে খুব সামান্যই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের মতে, দেশে এমনিতেই চাহিদার তুলনায় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ কম। তার ওপর মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। এতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে। অনেক এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না। শিল্পাঞ্চলের অনেক কারখানাও প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
এদিকে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা ও কমিশন বাড়ানোর দাবিতে সিএনজি স্টেশন মালিকরা আল্টিমেটাম দিয়েছেন। শিগগির তাদের দাবি-দাওয়া মেনে না নিলে লাগাতার ধর্মঘটেরও ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
চাহিদা ও সরবরাহে বড় ঘাটতি
দেশব্যাপী তীব্র গ্যাস সংকটের বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি। এ চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলছে। তবে এ বিপুল চাহিদার বিপরীতে নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি থেকে জাতীয় গ্রিডে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে প্রতিদিনই ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস ঘাটতি থাকছে।
সরবরাহকৃত গ্যাসের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে ১৭৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে ৯৫ কোটি ঘনফুট। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নতুন করে এলএনজি সরবরাহ ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে গেছে। এতে গ্যাসের সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটিতে সংকট বেড়েছে
গ্যাস সংকটের বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড জানিয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন এলাকার সব শ্রেণির গ্রাহক গ্যাসের স্বল্পচাপের মুখে থাকবেন। একই সঙ্গে অন্যান্য গ্যাস বিতরণ কোম্পানির গ্রাহকরাও সরবরাহ সংকটে পড়েছেন।
তিতাসের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এ দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে সেখান থেকে গড়ে ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এ টার্মিনাল থেকে সরবরাহ অর্ধেক কমে যাওয়ায় সবাই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে জানিয়েছে, কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধানে কাজ চলছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই জাতীয় গ্রিডে আগের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হবে।
আবাসিক ও শিল্প খাতে ভোগান্তি
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গ্যাসের চাপ না থাকায় ঢাকার অনেক এলাকায় রান্নাবান্না নিয়ে গৃহিণীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। গভীর রাতেও অনেকের বাসাবাড়িতে আগুন জ্বালানোর মতো গ্যাস আসছে না। হোটেল-রেস্তোরাঁয়ও দিনের বেলায় বিকল্প উপায়ে রান্নাবান্না করতে হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতেও গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উদ্যোক্তা ও মালিকদের। এতে উৎপাদন কমে গেছে এবং রপ্তানিমুখী শিল্প হুমকিতে পড়েছে বলেও অভিযোগ তাদের।
শান্তিনগর বাজার রোড এলাকার বাসিন্দা মমতাজ বেগম জানান, তাদের এলাকায় কিছুদিন ধরে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। সকাল ৭টায় নাস্তা তৈরি করতে চুলার কাছে গিয়ে দেখি গ্যাস নেই। ৩টার পর কিছু গ্যাস আসলে দুপুরের রান্নাবান্না করি। বিকাল থেকে আবার রাত ১২টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। মধ্যরাতে গিয়ে রাতের রান্নাবান্না করতে হয়। এতে অনেকটা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে জানান তিনি।
মিরপুর-২ এলাকার বাসিন্দা বশিরউদ্দিন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, তাদের এলাকায় সকাল থেকে রাত ৯/১০টা পর্যন্ত চুলায় গ্যাস থাকে না। ভোরে কিংবা রাতে দুই বেলার রান্না একবারে করতে হয়। মাঝেমধ্যে রাইস কুকারে ভাত রান্না করে বৈদ্যুতিক চুলায় কোনো রকমে ডিম ভেজে খাওয়া-দাওয়া সারছেন।
দ্রুত কমছে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন
বর্তমান গ্যাস সংকটের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন না করাকে দায়ী করছেন বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা। হাইড্রোকার্বন ইউনিটের তথ্যমতে, দেশে মোট গ্যাসের মজুত প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুত ২৮ দশমিক ৬২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এ পর্যন্ত ২৩ দশমিক ১২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। চাহিদা ও উত্তোলনের বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে নতুন গ্যাস যোগ না হওয়ায় মজুত দ্রুত কমে আসছে।
কিছু গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলেও বিভিন্ন জটিলতায় তা আশানুরূপভাবে গ্রিডে যোগ হচ্ছে না। নতুন গ্যাস উত্তোলন না হলে আগামী ১০ থেকে ১১ বছরের মধ্যে মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিছু কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে এবং সীমিত আকারে তা জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে। যদিও পরিসংখ্যানে এখনো তা প্রতিফলিত হয়নি। কারণ, গত ১৬ বছরে গ্যাসের মজুত নিয়ে কোনো সমীক্ষা চালানো হয়নি।
পেট্রোবাংলার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ১ ফেব্রুয়ারি সব গ্যাসক্ষেত্র থেকে এক হাজার ৯১১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করে জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হয়েছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি তা কমে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৮৭০ মিলিয়ন ঘনফুটে। পনেরো দিনের ব্যবধানে গ্যাসের উৎপাদন কমেছে ৪১ মিলিয়ন ঘনফুট।
হাইড্রোকার্বন ইউনিটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের প্রাথমিক মজুত ধরা হয়েছিল আট হাজার ৩৮৩ বিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুত ছিল পাঁচ হাজার ৭৫৫ বিলিয়ন ঘনফুট। ইতোমধ্যে ছয় হাজারের বেশি বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। উন্নয়নের ফলে এখানে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত কিছুটা বাড়ছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ গ্যাসক্ষেত্রসহ এ অঞ্চলের তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন। শেভরনের অপর দুটি গ্যাসক্ষেত্রের মজুতও শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স), বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) ও সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেড (এসজিএফএল) পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকেও গ্যাস উৎপাদন কমে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে ২০টির মজুত প্রায় শেষ পর্যায়ে। ফলে দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এ জন্য সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সংকটের মূলে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা
বিগত সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, ঘাটতি পূরণে নিজস্ব সম্পদ উত্তোলনের পরিবর্তে আমদানিনির্ভর হওয়ায় অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাত ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
২০১৭ সালের আগ পর্যন্ত দেশে কোনো গ্যাস আমদানি করতে হয়নি। ২০১৮ সাল থেকে ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। গত সাত বছরে জ্বালানি আমদানিতে পেট্রোবাংলার ব্যয় হয়েছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বাংলাদেশ ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের অংশ পেলেও সেখানে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমান জ্বালানি সংকটের জন্য উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানিনির্ভরতাকেই দায়ী করছেন তারা।
দেশের গ্যাস সংকটের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের ভুলনীতি ও আমদানিনির্ভরতাকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, দেশে গ্যাসের অনুসন্ধান না করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে আমদানি করেছে। এতে দেশের বিপুল অর্থ লোপাটের পাশাপাশি জ্বালানি খাতও ঝুঁকিতে পড়েছে। এর খেসারত এখন দেশবাসীকে দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধান ও বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এর ফল পেতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
সমন্বিত পদক্ষেপের পরামর্শ
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে এবং দক্ষতা বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, যেসব খাতে দুর্নীতি হয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশের স্থলভাগ, গভীর সমুদ্র ও অগভীর সমুদ্রে দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি এলএনজি আমদানি কমিয়ে দেশে গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
আরও পড়ুন:








