বুধবার

২২ জুলাই, ২০২৬ ৭ শ্রাবণ, ১৪৩৩

২২ জুলাই: চিরুনি অভিযানে দেশজুড়ে গণগ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬ ০৬:২১

শেয়ার

২২ জুলাই: চিরুনি অভিযানে দেশজুড়ে গণগ্রেপ্তার
ছবি সংগৃহীত

কারফিউ জারি এবং ২১ জুলাই আপিল বিভাগের রায়ের পরও থামেনি সংকট। বরং সোমবার (২২ জুলাই), স্বৈরাচারী সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর অবস্থানে যায়। সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের নাটকীয় অভিযোগ তুলে দেশজুড়ে শুরু হয় পুলিশের চিরুনি অভিযান। রাজধানীসহ সারা দেশে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য মামলার আসামিসহ প্রায় এক হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

রবিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে সোমবার (২২ জুলাই) সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ছয় ঘণ্টায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ৫১৬ জনকে। এ নিয়ে বুধবার (১৭ জুলাই) থেকে সোমবার (২২ জুলাই), এই ছয় দিনে সারা দেশে গ্রেপ্তারের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়ে যায়।

মামলা ও গ্রেপ্তার অভিযান

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সোমবার (২২ জুলাই) পর্যন্ত সারা দেশে ১৬৪টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ডিএমপিতে ৭১টি, চট্টগ্রাম মহানগরে ১৪টি এবং অন্যান্য জেলায় ৭৯টি মামলা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

একই দিন র‌্যাবের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন অভিযান চালিয়ে আরও ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করে। আগের দিনও নাশকতার অভিযোগে র‌্যাব ৩৯ জনকে আটক করেছিল।

ইন্টারনেট বন্ধ ও সরকারি সিদ্ধান্ত

সোমবার (২২ জুলাই) টানা পঞ্চম দিনের মতো দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ রাখে ফ্যাসিস্ট সরকার। একই সঙ্গে সাধারণ ছুটি আরও একদিন বাড়িয়ে মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) পর্যন্ত করা হয়।

এদিন কোটা সংস্কার-সংক্রান্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে রাতে স্বাক্ষর করেন তৎকালীন স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে গণভবনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি সহিংসতার জন্য বিএনপি, জামায়াত ও ছাত্রশিবিরকে দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন।

অন্যদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম চার দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম বহাল রেখে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি স্থগিত করার ঘোষণা দেন।

কারফিউ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

শুক্রবার (১৯ জুলাই) মধ্যরাত থেকে কার্যকর হওয়া কারফিউর এটি ছিল তৃতীয় দিন। দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়। এই সময় রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও মহাখালীতে আন্দোলনকারীরা কিছু সময়ের জন্য সড়ক অবরোধ করলে হাসিনার বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করে।

রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‌্যাবের কড়া অবস্থান দেখা যায়। সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়। আকাশে টহল দেয় পুলিশ ও র‌্যাবের হেলিকপ্টার।

এদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও দুই আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়। সোমবার (২২ জুলাই) পর্যন্ত আন্দোলনে নিহত ৬৮ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়।

পরিদর্শন ও সরকারি বক্তব্য

সোমবার (২২ জুলাই) সেনাপ্রধান যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন সেনাসদস্যদের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থে এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করছে।

একই দিনে যাত্রাবাড়ী এলাকা পরিদর্শনে যান তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, র‌্যাব মহাপরিচালক হারুন অর রশিদ এবং ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান। সেখানে আইজিপি আওয়ামী সুরে সুর মিলিয়ে বলেন, সংঘর্ষ ও নাশকতায় জড়িত প্রত্যেককে পাই পাই করে হিসাব দিতে হবে।

এ ছাড়া, ফ্যাসিস্ট সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, পরিস্থিতির উন্নতি হলেও কারফিউ বহাল থাকবে। পরদিন মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করার সিদ্ধান্তও জানানো হয়।

দেশজুড়ে অভিযান অব্যাহত

ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার অভিযোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত থাকে। শুধু চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কুমিল্লা, বগুড়া, রংপুর, টাঙ্গাইল, বরিশাল, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলা থেকেই শত শত মানুষকে আটক করা হয়।

এভাবে সোমবার (২২ জুলাই) আন্দোলনের রাজপথের সংঘর্ষ কিছুটা কমলেও গণগ্রেপ্তার, চিরুনি অভিযান, কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আন্দোলন এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে।



banner close
banner close