বৃহস্পতিবার

২৩ জুলাই, ২০২৬ ৭ শ্রাবণ, ১৪৩৩

জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬ ২০:৫৮

আপডেট: ২১ জুলাই, ২০২৬ ২১:০৩

শেয়ার

জুলাই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকা
ছবি সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই মাস। মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন তখন ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে। প্রথমদিকে আন্দোলনটি ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক, অহিংস ও যৌক্তিক। কিন্তু জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে এই আন্দোলন রূপ নেয় এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে।

আর সেই অভ্যুত্থানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শূন্যস্থান পূরণ করে রাজপথের দুর্ভেদ্য ঢাল হয়ে দাঁড়ায় দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

মন্তব্যের পর বদলে যায় আন্দোলনের রূপরেখা

রবিবার (১৪ জুলাই) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে একটি মন্তব্য করেন, যা পুরো দেশের ছাত্রসমাজের আত্মমর্যাদায় আঘাত হানে।

এই একটি শব্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে। সেই রাতেই বদলে যায় আন্দোলনের রূপরেখা।

সোমবার (১৫ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শাসকদলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। রড, রামদা আর স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের।

এই নারকীয় হামলার দৃশ্য দেখে আর ঘরে বসে থাকতে পারেনি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

আবু সাঈদের মৃত্যু ও প্রতিরোধের সূচনা

মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) দেশের পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরও উত্তপ্ত। রংপুরে পুলিশের গুলিতে দুই হাত প্রসারিত করে শহীদ হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। সাঈদের বুক ঝাঁজরা হওয়ার সেই দৃশ্য পুরো দেশের ঘুম কেড়ে নেয়।

যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমাজ 'ভীতু' কিংবা 'ফার্মের মুরগি' বলে ব্যঙ্গ করত, আবু সাঈদের রক্ত তাদের শিরায় শিরায় দ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

এদিনই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়িয়ে একটি বিশাল প্রতিরোধ বলয় তৈরি করে।

রাজপথের নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা

বুধবার (১৭ জুলাই) সরকার এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করে, শিক্ষার্থীদের বের করে দেয়। ক্যাম্পাসগুলো চলে যায় পুলিশ, র‍্যাব আর হাসিনার বাহিনীর দখলে।

আন্দোলন যখন নেতৃত্বহীন ও ছন্নছাড়া, ঠিক তখনই ঢাকার রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণেরা।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) 'কমপ্লিট শাটডাউন'। সকাল থেকেই মেরুল বাড্ডায় ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, রামপুরা-আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট, প্রগতি সরণিতে নর্থ সাউথ, আইইউবি, এআইইউবি, উত্তরায় বিইউপি, নর্দান এবং ধানমন্ডিতে ইউল্যাব, ড্যাফোডিল, স্টেট ও ইউআইইউর শিক্ষার্থীরা দুর্ভেদ্য দেয়াল গড়ে তোলে।

তরুণদের এই ঢল থামাতে বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) ও শুক্রবার (১৯ জুলাই) আকাশ থেকে হেলিকপ্টারে করে ছোঁড়া হয় টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেড।

মাটিতে বিজিবি, পুলিশ ও সোয়াট চালায় নির্বিচারে গুলি।

বাড্ডা থেকে উত্তরা পরিণত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে। মৃত্যুর ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগেও হাসিমুখে 'পানি লাগবে, পানি?' বলে ছুটে চলা সেনাশাসিত বিইউপির মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ।

একইভাবে, পুলিশের এপিসি থেকে নির্মমভাবে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলা হয় সেনাশাসিত আরেক বিশ্ববিদ্যালয় এমআইএসটির ইয়ামিনকে।

কিংবা প্রগতি সরণিতে নর্থ সাউথের প্রিয়মুখ আবদুল্লাহ আল আবির ও নর্দান ইউনিভার্সিটির আসিফ হাসান, বুলেটের সামনে বুক পেতে তারা প্রমাণ করেছিলেন দেশের জন্য জীবন দিতেও তারা পিছপা হন না।

অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা ও আক্ষেপ

এরপর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, রাতের আঁধারে ব্লক রেইড আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব প্রতিরোধের শেষে আসে সেই ঐতিহাসিক সোমবার (৫ আগস্ট)। ছাত্র-জনতার সুনামির মুখে পতন হয় ১৫ বছরের স্বৈরাচার শেখ হাসিনার।

দেশ স্বাধীনের পর রাষ্ট্র যখন প্রায় অকার্যকর, তখন এই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই হাতে তুলে নেয় দেশ গড়ার দায়িত্ব। ট্রাফিক সামলানো, চাঁদাবাজি রোধ থেকে শুরু করে দেয়াললিখন, সবকিছুতেই তারা ছিল সামনের সারিতে। কারণ তাদের লড়াইটা শুধু সরকারি চাকরির কোটার জন্য ছিল না, তারা চেয়েছিল এমন এক রাষ্ট্র, যা পথ হারাবে না।

প্রাথমিক দাবি কোটা সংস্কার হয়েছে, দেশ ফ্যাসিজমমুক্ত হয়েছে, এসব সবচেয়ে বড় অর্জন। কিন্তু রাষ্ট্র পুনর্গঠনের ধাপে এসে শুরু হয় এক নতুন বৈষম্য। যে শিক্ষার্থীরা ১৮ জুলাই খাদের কিনারা থেকে আন্দোলনকে টেনে তুলেছিল, অভ্যুত্থানের পর তাদের যেন সুকৌশলে দূরে সরিয়ে দেওয়া হলো। যাদের রক্তে প্রগতি সরণি, উত্তরা আর ধানমন্ডি রঞ্জিত হলো, নেতৃত্ব ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের রাখা হলো কেবল 'সহযোগী' হিসেবে। জুলাই আন্দোলনের পরপরই যেন সবার আগে বঞ্চিত করা হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব শিক্ষার্থীদের। রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা নিয়েও হতাশ এই তরুণরা।

রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা

দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ মানতে নারাজ ছাত্রসমাজ। সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

শিক্ষার্থীদের মতে, এই আন্দোলন শুধু কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের কোটি কোটি হতদরিদ্র মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন এবং বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে নতুন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই ছিল এই গণঅভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট।

রাষ্ট্র সংস্কারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দুর্নীতিকে চিহ্নিত করছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে চলা টেন্ডারবাজি, বদলি বাণিজ্য আর রাজনৈতিক চাঁদাবাজি এখনো বন্ধ হয়নি। সিস্টেমের পরিবর্তন না হলে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা।

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও হতাশ হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। টেন্ডারবাজি ছাড়া রাজনৈতিক দল পরিচালনা করা কঠিন, নেতাদের এমন মানসিকতায় ক্ষুব্ধ তারা।

ইতিহাস হয়তো অনেক কিছুই ভুলে যাবে। হয়তো ক্ষমতার পালাবদলে হারিয়ে যাবে অনেক নাম। কিন্তু ২০২৪ সালের 'শ্রাবণ বিপ্লব' কোনোদিন ভুলবে না সেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের কথা।

আজ হয়তো তারা ক্ষমতার মঞ্চে অবহেলিত। কিন্তু সেদিন যেমন ক্ষমতার জন্য এসব শিক্ষার্থী রাজপথে নামেনি, আজও তাদের চাওয়ায় ক্ষমতা নেই। আছে শুধু সেদিনের মতো রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের দাবি। চব্বিশের জুলাইয়ে তারা যে ধূমকেতুর মতো আছড়ে পড়েছিল বাংলার রাজপথে, তা চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কারণ, যারা স্বার্থহীনভাবে রক্ত দিতে জানে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদেরই মনে রাখে।



banner close
banner close