মঙ্গলবার

২১ জুলাই, ২০২৬ ৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩

রাশেদ খানের ডিগবাজি: হাসিনা মা থেকে তারেকের সহকারী

মোঃ আল আমিন

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬ ১৯:২৬

আপডেট: ২১ জুলাই, ২০২৬ ১৯:২৭

শেয়ার

রাশেদ খানের ডিগবাজি: হাসিনা মা থেকে তারেকের সহকারী
ছবি সংগৃহীত

রাজনীতির ময়দান যেন এক অদ্ভুত জাদুকরের মঞ্চ। একসময় পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনাকে মমতাময়ী মা বলে স্তুতি গাওয়া রাশেদ খান এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী। যা নিয়ে সব মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

বহুরূপী চরিত্র ও ভোল পাল্টানো

ঠিক এমনই এক বহুরূপী চরিত্রের নাম রাশেদ খান। একসময় যিনি পতিত স্বৈরাচারের স্তুতিতে রীতিমতো মশগুল ছিলেন। আওয়ামী আমলে শেখ হাসিনাকে মমতাময়ী মা আখ্যা দিয়ে তিনি ভক্তির যে পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিলেন তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আজও ব্যঙ্গবিদ্রূপ চলে।

তবে সমালোচনা রয়েছে ৫ আগস্টের পর সেই মায়ের বিদায়ঘণ্টা বাজতেই রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলেন এই নেতা। খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা রাশেদ হঠাৎ করেই আবির্ভূত হন শহীদ জিয়ার কট্টর আদর্শবাদী রূপে।

ক্ষমতার লোভ ও পল্টিবাজি

গুঞ্জন আছে নিজের হাতে গড়া দল গণঅধিকার পরিষদে যখন ডালপালা মেলার সুযোগ পাচ্ছিলেন না তখন স্রেফ ক্ষমতার লোভে তড়িঘড়ি করে নোঙর ফেলেন বিএনপির ঘাটে। আমজনতা তাই এই ডিগবাজির নাম দিয়েছে পল্টিবাজি।

মিত্রদের চরিত্রহনন ও গালাগালি

অভিযোগ রয়েছে নতুন দলে নিজের আসন পাকাপোক্ত করতে রাশেদ বেছে নেন এক মোক্ষম অস্ত্র মিত্রদের চরিত্র হনন। সমালোচকরা বলছে নিজেকে বড় প্রমাণ করতে গিয়ে তিনি সমমনা দলগুলোর দিকেই বিষোদ্গার শুরু করেন। কখনো জামায়াতে ইসলামীর গায়ে সেঁটে দিচ্ছেন জালেম তকমা। আবার কখনো এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর দিকে ছুঁড়ছেন দুর্নীতির কাল্পনিক অভিযোগ।

বাদ যাননি খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকও। তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও কাদা ছোঁড়াছুড়ি করতে দেখা গেছে এই নব্য আদর্শবাদীকে।

প্রতিদান ও উত্থান

আর রাজনৈতিক মহলে জোর গুঞ্জন অন্য দলগুলোকে এই গালাগালি আর বিষোদ্গারের চূড়ান্ত প্রতিদানও তিনি পেয়ে গেছেন হাতেনাতে। মিত্রদের ঘায়েল করে শীর্ষ মহলকে খুশি করার পুরস্কারস্বরূপ তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারী। তা-ও আবার একেবারে সচিব পদমর্যাদায়।

ছাত্রনেতাদের সমালোচনা

তবে তার এই জাদুকরী উত্থান দেখে খোদ ছাত্রনেতারাই হতবাক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহকারী পদে রাশেদ খানের নিয়োগ নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। সাথে প্রকাশ্যেই তকে মিথ্যা প্রোপাগান্ডার মেশিন তকমা দিয়েছেন তিনি।

এদিকে প্রবীণ রাজনীতিক কর্নেল অব মুহাম্মদ অলি আহমেদ বলেন যখন রাশেদ খানের মতো একজন চাটুকারকে সরকারের সহযোগী বানানো হয় তখন বুঝতে হবে বিএনপির রাজনীতিতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিচ্ছে।

ঔদ্ধত্য ও বিতর্কিত বক্তব্য

সমালোচকরা আরো বলছে পদ পাওয়ার আভাস পেয়েই হয়তো অহংকারে ঔদ্ধত্যের মাত্রা ছাড়িয়ে সম্প্রতি বিএনপি যদি আওয়ামী লীগকে একটু ছাড় দেয় তবে এনসিপি নেতাদের রীতিমতো বঙ্গোপসাগরে ডুবিয়ে মারার কঠোর মন্তব্য করেছেন রাশেদ খান।

পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের ভয় দেখিয়ে রাশেদ খান আসলে কীসের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তার এমন বক্তব্যে আওয়ামী লীগের প্রতি এক ধরনের প্রচ্ছন্ন সমর্থন এবং তাদের শক্তিমত্তারই প্রচার দেখছে অনেকেই।

শুধু তাই নয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে চলা শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনকেও বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন এই নেতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি দাবি করেন এই বিক্ষোভ নাকি পূর্বপরিকল্পিত এবং এর পেছনে শিবিরের উসকানি রয়েছে।

প্রশ্ন ও অভিযোগ

প্রশ্ন উঠেছে পতিত স্বৈরাচারের জুজু দেখিয়ে তিনি আসলে কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন। কার ইশারায় বিরোধী শিবিরের ঐক্যে ফাটল ধরানোর এই মহোৎসব চলছে। তা নিয়েও চলছে জল্পনা কল্পনা।

কান পাতলেই শোনা যায় রাশেদের এই বিতর্কিত অতীত এখানেই শেষ নয়। সাবেক সহযোদ্ধারাই তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি আর আর্থিক কেলেঙ্কারির পাহাড়সম অভিযোগ তুলছেন। আওয়ামী লীগের কাছ থেকেও নানা সুবিধা নেয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সমীকরণ ও আহ্বান

সব অঙ্ক মিলিয়ে রাজনৈতিক বোদ্ধাদের একটাই সরল সমীকরণ রাশেদ খানের নিজস্ব কোনো গন্তব্য বা আদর্শ নেই। ক্ষমতার বাতাস যেদিকে বয় তার পালও সেদিকেই ঘোরে। তার এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিষোদ্গারকে মূলত ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিকে দুর্বল করার এক সুপরিকল্পিত ছক হিসেবেই দেখছে বিশ্লেষকরা। আর তাই দেশের স্বার্থে রাশেদ খানকে ইতিবাচক রাজনৈতিক চর্চার আহ্বান সচেতন নাগরিকদের।



banner close
banner close