মঙ্গলবার

২১ জুলাই, ২০২৬ ৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩

২১ জুলাই: কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল তবুও থামেনি আন্দোলন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১ জুলাই, ২০২৬ ০৭:০১

শেয়ার

২১ জুলাই: কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল তবুও থামেনি আন্দোলন
ছবি সংগৃহীত

টানা কয়েকদিনের রক্তক্ষয়ী হামলা, কারফিউ ও প্রাণহানির পর রবিবার (২১ জুলাই) চাপে পড়ে আন্দোলনের মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করে সরকার। সেদিন সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহাল-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল করে দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে এবং ৭ শতাংশ কোটা রেখে নতুন কাঠামো অনুযায়ী দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু, আদালতের এই রায়ের দিনও আন্দোলন থামায়নি ছাত্র-জনতা। কারণ, ততদিনে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে স্বৈরাচারি সরকার।

আপিল বিভাগের রায়

সেদিন, সকাল ১০টার দিকে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি শুরু হয়। সব পক্ষের বক্তব্য শেষে দুপুর ১টার দিকে সর্বসম্মত রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে বলা হয়, সরকারি চাকরিতে ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ১ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১ শতাংশ কোটা থাকবে। নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে সেই পদ সাধারণ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করতে হবে। একইসঙ্গে, প্রয়োজন হলে সরকার ভবিষ্যতে কোটা ব্যবস্থা সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

আন্দোলনকারীদের প্রতিক্রিয়া

আপিল বিভাগের এ রায়কে, সেদিন ইতিবাচক হিসেবে স্বাগত জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন, আদালতের রায়কে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন, তবে সরকারের নির্বাহী আদেশকেই চূড়ান্ত বাস্তবায়ন হিসেবে বিবেচনা করবেন।

এরপর আন্দোলনকারীরা কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। তবে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে চার দফা দাবি বাস্তবায়নের আল্টিমেটাম দেয়া হয়। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল, কারফিউ প্রত্যাহার, ইন্টারনেট চালু, বিশ্ববিদ্যালয় ও আবাসিক হল খুলে দেয়া এবং আন্দোলনের সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

একইসঙ্গে আন্দোলনে নিহতদের হত্যার বিচারসহ আট দফা দাবির বাস্তবায়ন এবং ২২ জুলাই দেশব্যাপী গায়েবানা জানাজার কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়।

অব্যাহত সংঘর্ষ ও হামলা

তবে আদালতের রায়েও মাঠের পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধের মধ্যেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা অব্যাহত রাখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এদিন ঢাকাসহ সারাদেশে অন্তত ১৯ জন নিহত হন। হামলায় কয়েকশ মানুষ আহত হন, যাদের অনেকের অবস্থা ছিল আশঙ্কাজনক।

সিদ্ধিরগঞ্জে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১৯টি যানবাহনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। রাজধানীর বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, কুড়িল ও মিরপুর এলাকাতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলার প্রতিবাদ করে আন্দোলনকারীরা।

উদ্ধার নাহিদ ইসলাম

এদিন চতুর্থ দিনের মতো সারাদেশে ইন্টারনেট বন্ধ এবং কারফিউ কার্যকর ছিল। ভোরে পূর্বাচল এলাকা থেকে, গুম হওয়া আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে ১৯ জুলাই গভীর রাতে তাকে তুলে নিয়ে গুম করা হয়।

সরকারি ছুটি থাকায় সারা দেশের পোশাক কারখানাসহ বড় শিল্প-কারখানাগুলোও বন্ধ ছিল। স্বৈরাচারী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানান, ২২ জুলাইও কারফিউ বহাল থাকবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তা শিথিল করা হবে।

গ্রেপ্তার ও মামলা

চলমান আন্দোলনের মাঝেই দেশের বিভিন্ন স্থানে মামলা হয়। এর আগের পাঁচ দিনে ঢাকায় প্রায় ২০০ জনসহ সারাদেশে অন্তত ৫৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানা যায়। সন্ধ্যার পর থেকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিহতদের তথ্য গণমাধ্যমে দেয়া বন্ধ করে দেয়।

সেতু ভবন, বিটিভি ভবন ও অন্যান্য স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পৃথক মামলায় বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নিপুণ রায় এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে রিমান্ডে নেয়া হয়। একই সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি অংশ ৯ দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

এরইমাঝে, গাজীপুরের সাবেক মেয়র ও ফ্যাসিবাদী নেতা জাহাঙ্গীর আলমের বাসভবনে, ক্ষোভে দ্বিতীয় দফায় হামলা করে ছাত্র-জনতা।

২১ জুলাই রাতেও দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গণভবনে সামরিক ও বেসামরিক শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। আদালতের রায়ে কোটা ইস্যুর একটি আইনি সমাধানের পথ তৈরি হলেও, দেশের রাজনৈতিক সংকট ও আন্দোলনের উত্তেজনা তখনও কাটেনি। হত্যার বিচারের নতুন দাবিতে আন্দোলনে পরবর্তী কর্মসূচির প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়।



banner close
banner close