কারফিউ উপেক্ষা করে রাজপথে ছাত্র-জনতা; লাশের মিছিল। কারফিউয়ের মধ্যে সেনা, পুলিশ ও র্যাবের টহল অব্যাহত; তবুও আন্দোলন।
১৯ জুলাইয়ের ভয়াবহ সহিংসতা, কারফিউ জারি এবং সেনা মোতায়েনের পর ২০ জুলাই শনিবার কার্যত কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে দিন শুরু হয়। দেশজুড়ে কারফিউ, সেনাবাহিনীর টহল, ইন্টারনেট বন্ধ এবং থমকে যাওয়া জনজীবনের মধ্যেও থামেনি সরকারি বাহিনীর বর্বরতা। একই দিনে প্রথমবারের মতো সরকার আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনার আগ্রহ দেখায়।
প্রথম দফায় ১৯ জুলাই মধ্যরাত থেকে ২০ জুলাই দুপুর ১২টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর থাকে। দুই ঘণ্টার বিরতির পর দুপুর ২টা থেকে আবার কারফিউ শুরু হয়, যা ২১ জুলাই বিকেল ৩টা পর্যন্ত বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। পাশাপাশি ২১ ও ২২ জুলাই সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমএ ২১ জুলাই থেকে দেশের সব পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত জানায়।
এদিন টানা তৃতীয় দিনের মতো ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকে। কারফিউর কারণে সড়কে যানবাহন ও মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই সীমিত। তবে এর মাঝেই রাজপথে ছিল আন্দোলনকারীরা। দেশের বিভিন্ন স্থানে হাসিনার বাহিনীর হামলায় এদিন প্রাণ যায় অন্তত ৩৭ জনের। এর মধ্যে ঢাকায় ২৫ জন, ময়মনসিংহ ও সাভারে চারজন করে, গাজীপুরে দুইজন এবং নরসিংদীতে দুইজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
এরই মধ্যে শুক্রবার দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়।
স্বৈরাচার সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বিএনপি-জামায়াত ও তাদের সমর্থকেরা সহিংসতা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা বলেন, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তাদের ব্যানার ব্যবহার করে কেউ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে সেটি আন্দোলনের অংশ নয়।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, দমন-পীড়নের মাধ্যমে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। অন্যদিকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপি-জামায়াত দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
কারফিউর মধ্যেও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, সায়েন্সল্যাব, উত্তরা, মেরুল বাড্ডা ও মিরপুর এলাকায় আন্দোলন করে ছাত্র-জনতা। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছুড়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। পুলিশ ও আওয়ামী লীগের হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত ও প্রায় ৯০ জন আহত হন এসব এলাকায়।
মিরপুরে দিনভর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে এবং মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
কারফিউর কারণে রাজধানীর প্রধান বিপণিবিতান ও দোকানপাট বন্ধ ছিল। ডিএমপি জানায়, কারফিউ অমান্য করলে এক বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রয়েছে।
এদিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর একটি ঘটে গভীর রাতে। মিন্টো রোডের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন সমন্বয়কের সঙ্গে বৈঠকে বসেন সরকারের মন্ত্রীরা। সেখানে আন্দোলনের প্রতিনিধিরা আট দফা দাবি উত্থাপন করেন এবং জানান, এসব দাবি বাস্তবায়নের অগ্রগতি হলেই কেবল কোটা সংস্কারের মূল দাবি নিয়ে আলোচনায় বসবেন।
বৈঠক শেষে ফ্যাসিস্ট সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত দাবিগুলো যৌক্তিক ও সমাধানযোগ্য। তবে তার এই বক্তব্য ছিল একপাক্ষিক এবং আন্দোলনকে দমানোর একটি অপকৌশল।
রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদারে সারাদিন র্যাবের হেলিকপ্টার টহল দেয়। বঙ্গভবন, গণভবন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, কারাগার এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাসভবনে বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়া হয়।
ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ চেকপোস্ট বসায়। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হলে ডিএমপির কারফিউ পাস সংগ্রহ করতে হয়।
দিনভর যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, রায়েরবাগ, কাজলা, রামপুরা, বনশ্রী, বাড্ডা, ভাটারা, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, আজিমপুর ও উত্তরার বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ চলতে থাকে। ইউআইইউ, নর্থ সাউথ, আইইউবিসহ বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে আগের দিনগুলোর মতোই সক্রিয় থাকে। উত্তরা আজমপুরে রেললাইন অবরোধ ও হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবাদের ঢেউ পৌঁছে যায়।
সাভারেও আন্দোলনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করায় পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে ছাত্র-জনতা। হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে। পরে সেনাবাহিনী মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
কারফিউ, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা, অব্যাহত সংঘর্ষ ও প্রাণহানির মধ্যেই ২০ জুলাই শেষ হয়। তবে একই দিনে সরকার ও আন্দোলনের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক সংলাপের সূচনা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে নতুন মাত্রা যোগ করে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে সংলাপ বয়কট করে, অকপটে।
আরও পড়ুন:








