২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথের সামনের সারিতে থাকা বহু আন্দোলনকারী এখন অন্তরালে চলে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠা অনেক মুখ, গুলিবিদ্ধ ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের দাবি, গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরও তারা প্রত্যাশিত স্বীকৃতি, চিকিৎসাসহায়তা ও ন্যায়বিচার পাননি।
প্রতীক হয়ে ওঠা আন্দোলনের মুখগুলো
শুক্রবার (২ আগস্ট) রাজধানীর উত্তরার রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ প্রাঙ্গণে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী আটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্বিচার গুলির প্রতিবাদে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ চলছিল। সেখানে বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকেরা যোগ দেন। এই বিক্ষোভে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে রিকশায় দাঁড়িয়ে স্লোগানরত শায়লা আক্তার শশীর ছবিটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রতীকী চিত্রে পরিণত হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) থেকেই রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
রবিবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর কারওয়ান বাজার এলাকায় পুলিশের বন্দুকের নলের সামনে টিনের তৈরি ঢাল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন স্যানিটারি মিস্ত্রি মো. নাসির খান। সোমবার (২২ জুলাই) থেকে আন্দোলনে নামা নাসির সেদিন রাস্তার পাশের একটি অস্থায়ী বেড়া থেকে টিন খুলে ঢাল বানিয়ে পুলিশের সামনে চলে যান। একপর্যায়ে তাঁর কপাল ও হাতে ছররা গুলি লাগে। তাঁর ঠিক পাশের আরেকজন আন্দোলনকারীও সেদিন গুলিবিদ্ধ হন।
এর আগে শুক্রবার (১৯ জুলাই) উত্তরা পূর্ব থানার সামনে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের আলোচনা চলাকালে পরিস্থিতির অবনতি হলে সরাসরি গুলি ছোড়া হয়। প্রথম গুলিটি লাগে রায়হান মোল্লার গায়ে। হাত থেকে মাইক পড়ে যাওয়ার পর তিনি সড়ক বিভাজকের পাশে আশ্রয় নেন। সেই রক্তাক্ত মুহূর্তের ছবিটিও ব্যাপক আলোচিত হয়।
আটক, প্রতিবাদ ও নির্যাতনের অভিযোগ
বুধবার (৩১ জুলাই) মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচিতে হাইকোর্ট এলাকার মাজার গেটের সামনে পুলিশ মো. নাহিদুল ইসলামকে আটক করে। আটকের সময় পুলিশের তাঁর মুখ চেপে ধরার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় তোলে।
একই দিন একই কর্মসূচিতে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান পুলিশের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে এক সহপাঠীকে আটকের প্রতিবাদ জানান।
আন্দোলন যখন তুঙ্গে, সোমবার (১৫ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। সেদিন দেখা যায়, ভিসি চত্বর থেকে আরেক নারী শিক্ষার্থীর হাত ধরে দৌড়ে পালাচ্ছেন ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী লামিয়া রায়হান। এই ছবির অন্তরালে রয়েছে আরও কিছু ভয়াবহ অভিযোগ। জানা যায়, সেদিনের ওই হামলায় ছাত্রলীগ শুধু লাঠিপেটাই করেনি, বরং বেশ কয়েকজন নারী শিক্ষার্থীর ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়, যার মধ্যে ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
এই ভুক্তভোগী জুলাই যোদ্ধার অভিযোগ, ঘটনাটি এনসিপির নেতাকর্মীদের জানানোর পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা।
অবহেলা ও মূল্যায়ন না হওয়ার অভিযোগ
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর দৃশ্যপট অনেকটাই ভিন্ন। সেদিন জীবনের মায়া কাটিয়ে সামনের সারিতে থাকা এই যোদ্ধারা আজ অনেকটাই অন্তরালে। তথ্য বলছে, জুলাইয়ের শহীদদের যথাযথ মূল্যায়ন আজও হয়নি। অসংখ্য আহত ব্যক্তি এখনো নিজেদের খরচেই চিকিৎসা চালাতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনকি আন্দোলনে অনেক গুলিবিদ্ধের নামও আহত যোদ্ধাদের তালিকায় ওঠেনি। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন, আহতদের অবহেলা এবং সামনের সারিতে থাকাদের হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে এনসিপির শীর্ষ নেতা ও ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কদের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁদের পাওয়া যায়নি।
প্রত্যাশা অপূর্ণ থাকার দাবি
রাজপথের এই যোদ্ধাদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন বড় অর্জন হলেও রাষ্ট্র সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণহত্যার বিচার এবং দুর্নীতি দমনে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। যে বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে মানুষ জীবন দিয়েছিল, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্বে সেই প্রত্যাশা আজও অপূর্ণ। সমালোচনা রয়েছে, পরিবর্তন শুধু দলের হয়েছে, কিন্তু যে ব্যবস্থা বদলের জন্য এত আত্মত্যাগ, সেই একই ব্যবস্থার মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে দেশ।
আরও পড়ুন:








