চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর উত্তরায় মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে ২৬ জনের বিরুদ্ধে বিচার চলমান রয়েছে। তবে মুগ্ধের পরিবারের পক্ষ থেকে বিচার নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, এর পেছনে হত্যাকাণ্ডে জড়িতরা প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় বিভিন্ন ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং এখনো তারা নানা মাধ্যমে হুমকি পাচ্ছেন।
মুগ্ধর ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত বলেন, মুগ্ধ হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পূর্ণ হয়েছে এই জুলাইয়ে। ইতোমধ্যে চার্জশিট জমা হয়েছে, ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ হয়েছে। এসবই হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। তবে নতুন সরকার আসার পর দুই মাস শুনানি পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। তাহলে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশ্য কী? দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতেই তো এটি গঠন করা হয়েছে। এখন কেন বিলম্ব হচ্ছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এতে আমরা খুবই হতাশ।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মামলার বিচার কার্যক্রমে গতি ছিল। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সেই গতি আরো বাড়বে বলে আশা করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে বিচার প্রক্রিয়া আরো মন্থর হয়ে গেছে। চিফ প্রসিকিউটর পরিবর্তন হয়েছে, তার টিমেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু সে কারণে শুনানি পিছিয়ে দেয়ার তো কোনো মানে হয় না।
বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর আমরা বুঝেছিলাম, পুলিশ স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারবে না। তাই নিজেরাই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পরিপূর্ণ একটি তথ্য প্রতিবেদন নিজেরাই রেডি করে দিয়েছি। কোথা থেকে গুলি হয়েছে, কারা করেছে, কীভাবে মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হয়েছে-সবকিছুর ভিডিও প্রমাণ রয়েছে।
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের নাম ছাড়া আমরা সব ফুটেজ দিয়ে বলেছি, আপনারা এখন ডিটেক্ট করে নেন। পিডিআর থেকে আপনারা সহজেই দেখতে পারবেন, কারা কারা ওখানে ছিল। ফুটেজ থেকে চেহারাগুলো ক্লিয়ার করে পুলিশের ডেটাবেজ থেকে খুঁজে বের করে নেয়া যায়। তারা সাক্ষী দেবে, কারা তাদের নির্দেশ দিয়েছে।
দীপ্ত বলেন, তথ্যপ্রমাণ জমা দেয়ার প্রায় ২০ দিন পর তদন্ত সংশ্লিষ্টরা তাদের জানান, মুগ্ধ হত্যার মামলায় এত বেশি তথ্যপ্রমাণ রয়েছে, ১৮ ও ১৯ জুলাই উত্তরায় নিহত ও গুরুতর আহত অন্যদের বিচারেও তা ব্যবহার করা যাবে। অন্য শহীদ পরিবারের কথা বিবেচনা করে আমরা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সেটাই ভুল ছিল। তারা বলেছিল, শুধু মুগ্ধ হত্যার বিচার হলে এক মাসের মধ্যেই চার্জশিট দেয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু অন্য মামলাগুলো যুক্ত হওয়ায় দুই বছর পার হয়ে গেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিচার কেন ধীরগতির—এমন প্রশ্নের জবাবে দীপ্ত বলেন, অভিযুক্তদের অনেকেই প্রশাসনের সদস্য হওয়ায় তাদের প্রভাব বিচার প্রক্রিয়ায় পড়ছে। হয়তো বলা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ ও মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ যমজ ভাই। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই, ২৫ বছর বয়সে রাজধানীর উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে আন্দোলন চলাকালে গুলিতে নিহত হন মুগ্ধ। তার মৃত্যুর পর থেকে পুরো পরিবারের জীবনধারা বদলে গেছে বলে জানান দীপ্ত। তিনি বলেন, মায়ের কাছে এখনো বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হয়। ঘুমের মধ্যে তিনি হঠাৎ চিৎকার করে বলেন, ‘মুগ্ধ, ওই দিকে যাস না, এদিকে আয়।’
তার ভাষায়, ঈদ, জন্মদিন কিংবা পারিবারিক বিশেষ দিনগুলো এখন সবচেয়ে বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে শহীদ পরিবারগুলোর এই বেদনা কিছুটা হলেও লাঘব হতে পারে।
আরও পড়ুন:








