সোমবার

২০ জুলাই, ২০২৬ ৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩

ভুল জরিপ, দুর্বল পরিকল্পনায় লোকসানের মুখে কর্ণফুলী টানেল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৩২

শেয়ার

ভুল জরিপ, দুর্বল পরিকল্পনায় লোকসানের মুখে কর্ণফুলী টানেল
ছবি সংগৃহীত

দেশের প্রথম নদীর তলদেশের সড়ক টানেল কর্ণফুলী টানেল প্রত্যাশিত যানবাহন চলাচল না পাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে। ভুল ট্রাফিক জরিপ, প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়কের অভাব এবং আনোয়ারা প্রান্তে পরিকল্পিত শিল্পায়ন সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় টানেলটি প্রত্যাশিত আয় করতে পারছে না। ফলে টোল আদায় দিয়ে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকাশিত এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে আর্থিক অনিয়ম, দুর্বল পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত চাহিদা মূল্যায়নের ঘাটতি ছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে ধারণাকৃত যানবাহনের মাত্র ১৪ শতাংশ টানেল ব্যবহার করছে। এতে প্রতি মাসে প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে সরকারকে।

প্রকল্প ব্যয় ও সময় দুইই বেড়েছে

আইএমইডি জানায়, ২০১৩ সালের প্রাথমিক সমীক্ষায় চট্টগ্রামকে সাংহাইয়ের আদলে ‘এক নগর, দুই শহর’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়। লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের যানজট কমানো এবং চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কার্যকর সংযোগ তৈরি করা।

২০১৫ সালে প্রকল্প অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। পরে দুই দফা সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকায়। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে টানেল চালু হয়।

ট্রাফিক পূর্বাভাসের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ব্যবধান

প্রাথমিক পরিকল্পনায় ধারণা করা হয়েছিল, চালুর পর প্রতিদিন ১৭ হাজার যানবাহন টানেল ব্যবহার করবে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ২৮ হাজার ৩০০ ছাড়াবে। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার যানবাহন চলাচল করছে। এর বেশিরভাগই ব্যক্তিগত ও হালকা যানবাহন হওয়ায় টোল আদায়ও প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।

আইএমইডি বলছে, ২০১৩ সালের ট্রাফিক জরিপ বাস্তব তথ্যের পরিবর্তে অনুমাননির্ভর ছিল। বাস্তবে সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা যথাযথভাবে গণনা না করেই ভবিষ্যৎ চাহিদার হিসাব করা হয়েছিল।

বর্তমানে টানেল থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ লাখ টাকা টোল আদায় হলেও পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিদিন ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২২ লাখ টাকা। ফলে দৈনিক আয়ে ব্যয়ের অর্ধেকও পূরণ হচ্ছে না।

বিদেশি নির্ভরতায় পরিচালনা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানেল পরিচালনায় বাংলাদেশের নিজস্ব দক্ষ কারিগরি জনবল এখনও গড়ে ওঠেনি। সেতু কর্তৃপক্ষের কোনো স্থায়ী টেকনিক্যাল টিম না থাকায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এখনও চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ নির্ভরতা পরিচালন ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে আইএমইডি।

আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

আইএমইডির প্রতিবেদনে প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সার্ভিস এরিয়া, বাংলো, মোটেল ও কনভেনশন সেন্টারের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। টানেল প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে এসব স্থাপনার সম্পর্ক স্পষ্ট নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি অডিটে প্রকল্পে মোট ৬৮টি আপত্তি পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ৪৮টি বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত। এর মধ্যে রয়েছে যথাযথ যৌক্তিকতা ছাড়াই প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে সার্ভিস এরিয়া নির্মাণ, প্রায় ২৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় এবং সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ না করে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ। আইএমইডি এসব অনিয়ম দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ করেছে।

লোকসান কমাতে সুপারিশ

টানেলকে আর্থিকভাবে টেকসই করতে আইএমইডি কয়েকটি সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মাতারবাড়ী বন্দরের সঙ্গে সংযোগকারী ৭৪ কিলোমিটার সড়কের কাজ দ্রুত শেষ করা, আনোয়ারা-বাঁশখালী-সাতকানিয়া সড়ক প্রশস্ত করা, আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং ব্যবসায়ীদের এ রুট ব্যবহারে উৎসাহিত করা।

এ ছাড়া ডিজিটাল টোল সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু, মালবাহী ট্রাক চলাচলের রুট পরিকল্পনা, অব্যবহৃত মোটেল ও কনভেনশন সেন্টার আন্তর্জাতিক হোটেল চেইনের কাছে ইজারা দেওয়া এবং নিজস্ব দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি।

বিশেষজ্ঞের মতামত

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়ার আগে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর সমন্বিত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

তার ভাষ্য, শুধু টানেল নির্মাণ করলেই প্রকল্প সফল হয় না। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সড়ক, শিল্পাঞ্চল ও অন্যান্য অবকাঠামোও একই সময়ে চালু করতে হয়। কর্ণফুলী টানেলের মূল প্রত্যাশা ছিল আনোয়ারায় গড়ে ওঠা চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে পণ্য ও যানবাহনের চলাচল বৃদ্ধি পাওয়া। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রত্যাশিত ট্রাফিক তৈরি হয়নি।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন অতিরিক্ত ব্যয় শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন ছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল অবকাঠামোর পাশাপাশি সহায়ক প্রকল্পগুলোও সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।



banner close
banner close