রবিবার

১৯ জুলাই, ২০২৬ ৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩

১৯ জুলাই: আওয়ামী বাহিনীর হামলায় রক্তাক্ত বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৯ জুলাই, ২০২৬ ০৭:৩৪

আপডেট: ১৯ জুলাই, ২০২৬ ০৭:৩৬

শেয়ার

১৯ জুলাই: আওয়ামী বাহিনীর হামলায় রক্তাক্ত বাংলাদেশ
ছবি সংগৃহীত

ফিরে দেখা জুলাই; শিক্ষার্থীদের সাথে যোগ দেয় বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ। শাটডাউন ঘিরে দেশজুড়ে সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও অগ্নিসংযোগ; রাতে জারি হয় কারফিউ। ১৮ জুলাই হাসিনার বাহিনীর রক্তক্ষয়ী তাণ্ডবের পরও আন্দোলন থেকে পিছুপা হয়নি শিক্ষার্থীরা। শুক্রবার (১৯ জুলাই) দ্বিতীয় দিনের মতো দেশব্যাপী কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি পালন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। দিনভর রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও প্রাণহানির ঘটনায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।

এদিন হাসিনার সরকারের নির্দেশে সারাদেশে অন্তত ৬৭ জনকে হত্যা করা হয়। নিহতদের মধ্যে শুধু ঢাকাতেই প্রাণ হারান অন্তত ৬২ জন। রাজধানীর বাইরে রংপুর, গাজীপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ, সিলেট, নরসিংদী, মাদারীপুর ও সাভারসহ বিভিন্ন এলাকায় আরও হতাহতের ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থী, পথচারী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মীসহ কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়।

দিনভর শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ওপর পুলিশ, র‍্যাব এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সশস্ত্র হামলা চালায়। বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। র‍্যাবের হেলিকপ্টার থেকেও ছোড়া হয় গুলি।

হামলার পর রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে গুলিবিদ্ধ ও আহত মানুষের ঢল নামে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে আহতদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খেতে হয় চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের।

দিনভর হামলার পর রাতে গণভবনে জরুরি বৈঠকে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, বিজিবির মহাপরিচালক ও ডিএমপি কমিশনার। বৈঠক শেষে শুক্রবার (১৯ জুলাই) রাত ১২টা থেকে সারাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়কে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা। বেলা ১১টার দিকে রামপুরা ও যাত্রাবাড়ীতে প্রথম বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, উত্তরা, মহাখালীসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। প্রেসক্লাব ও পল্টন এলাকাতেও উত্তেজনা দেখা দেয়।

দিনভর আন্দোলরত ছাত্র-জনতার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হলে বিক্ষুপ্ত জনতা রামপুরা থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি, মিরপুর-১০ থেকে পুরবী পর্যন্ত একাধিক পুলিশ বক্স, বনানীতে বিআরটিএর সদর দপ্তর, মিরপুরের বিআরটিএ মেট্রো-১ কার্যালয় এবং মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। বিআরটিএ কার্যালয়ে থাকা বেশ কয়েকটি গাড়িতেও আগুন দেয়া হয়।

একইভাবে মেট্রোরেলের কাজীপাড়া স্টেশনেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ফলে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একইসঙ্গে রাজধানীতে গণপরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দূরপাল্লার বাস, ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে এবং ঢাকা থেকে আন্তর্জাতিক কয়েকটি ফ্লাইটও বাতিল করা হয়।

আন্দোলনের এই পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ায় অভিভাবকরাও। রাজধানীর শাহবাগে ‘সন্তানের পাশে অভিভাবক’ ব্যানারে মানববন্ধন করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

রাজধানীর বাইরে খুলনা, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, রংপুর, মানিকগঞ্জ, রাজশাহী, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুরেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। নরসিংদী জেলা কারাগার থেকে বন্দিরা বের হয়ে আসে এবং হাসিনার পালিত পুলিশ বাহিনীর ওপর ক্ষোভ থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ ছিনিয়ে নেয়া হয়।

এদিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চলমান আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

অন্যদিকে বিজিবির তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী হুমকি দিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে পুঁজি করে যারা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে তাদের শক্ত হাতে দমন করা হবে।

সরকারের সংলাপের প্রস্তাব আবারও প্রত্যাখ্যান করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেন এবং কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

একইদিন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে নৈরাজ্যের অভিযোগ এনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার বুলি ছুড়ে দেন।

দিনভর আওয়ামী বাহিনীর ভয়াবহ হামলার পর মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয় সারাদেশব্যাপী কারফিউ এবং সেনাবাহিনী মাঠে নামে। অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা ৯ দফা দাবিতে কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়। সংঘর্ষ, ব্যাপক প্রাণহানি, রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন এবং রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্য দিয়ে ১৯ জুলাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও আলোচিত দিনগুলোর একটিতে পরিণত হয়।



banner close
banner close