রবিবার

১৯ জুলাই, ২০২৬ ৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

দূরত্ব ১৬ হাজার কিমি, তবু বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যেন আরেক আর্জেন্টিনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ২১:৫২

আপডেট: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ২২:০৮

শেয়ার

দূরত্ব ১৬ হাজার কিমি, তবু বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যেন আরেক আর্জেন্টিনা
ছবি সংগৃহীত

বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলেই ক্রিকেটপ্রধান বাংলাদেশ যেন রূপ নেয় এক ফুটবলপাগল দেশে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে উড়তে থাকে আকাশি সাদা আর্জেন্টিনার পতাকা। ছাদ, সড়ক, দোকানপাট ও আবাসিক ভবনজুড়ে দেখা যায় আর্জেন্টিনার রঙ, আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বড় পর্দায় হাজারো দর্শকের উপস্থিতিতে আয়োজন করা হয় বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখার অনুষ্ঠান। প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের দেশ বাংলাদেশ এখনো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে না পারলেও, প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার দূরের আর্জেন্টিনাকে নিজেদের দল হিসেবে সমর্থন করেন অসংখ্য বাংলাদেশি।

ম্যারাডোনা থেকে মেসি

বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হলেও, ক্রীড়া সাংবাদিক শামীম চৌধুরীর মতে, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগো ম্যারাডোনার অসাধারণ নৈপুণ্য এবং পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ই বাংলাদেশে দলটির জনপ্রিয়তার ভিত্তি গড়ে দেয়।

তার ভাষ্য, সে সময় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয়ও বাংলাদেশিদের কাছে প্রতীকী গুরুত্ব বহন করেছিল। তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে কাজ করা শামীম চৌধুরীর মতে, লাতিন আমেরিকান ফুটবলারদের ড্রিবলিংভিত্তিক নান্দনিক ফুটবল বাংলাদেশের দর্শকদের বরাবরই আকৃষ্ট করেছে। ম্যারাডোনার পর লিওনেল মেসি সেই ধারাকে আরও জনপ্রিয় করেছেন। বিশেষ করে ২০২২ সালে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের পর বাংলাদেশে এই সমর্থন আরও বিস্তৃত হয়েছে।

বিশাল জার্সির আয়োজন

ঢাকার ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নাফিজ মাহমুদ আলিফ ও তার বন্ধুরা আগের দুই বিশ্বকাপে ২০০ ফুট দীর্ঘ আর্জেন্টিনার পতাকা তৈরি করেছিলেন। তবে সেটি অন্যান্য বড় পতাকার ভিড়ে আলাদা করে নজর কাড়তে পারেনি। তাই এবার তারা নতুন উদ্যোগ নেন।

আলিফ জানান, প্রায় এক মাস পরিকল্পনা করে তারা ৪০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট চওড়া একটি বিশাল আর্জেন্টিনা জার্সি তৈরি করেন। পরে সেটি দুটি দশতলা ভবনের মাঝখানে উত্তোলন করা হয়। এই আয়োজন হাজারো দর্শকের পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূতেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি প্রতিনিধিদলের সদস্যদের নিয়ে জার্সিটি দেখতে যান।

সমর্থনের কূটনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার বিপুল সমর্থকগোষ্ঠীর বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও আলোচনায় আসে। ২০২২ সালে দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকায় পুনরায় দূতাবাস চালু করে আর্জেন্টিনা, যার পেছনে দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক আগ্রহ ও সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভালোবাসা

অনেকের কাছে আর্জেন্টিনার প্রতি সমর্থন পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। ৪৪ বছর বয়সী মঈনুদ্দীন দেওয়ান জানান, শৈশব থেকেই তিনি আর্জেন্টিনার সমর্থক এবং দলের পরাজয় তিনি মেনে নিতে পারেন না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর তিনি নিজের গ্রামে প্রায় ৫০০ মানুষকে নিয়ে বিজয় মিছিলের নেতৃত্ব দেন।

তার ভাষায়, চারদিকে মেসি ও আর্জেন্টিনার নামে স্লোগান উঠছিল। একের পর এক মিছিল ঘুরতে দেখে তিনি আনন্দে সারারাত উদযাপন করেছিলেন।

অন্যদিকে, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন শিক্ষার্থী কিবরিয়া রাফি জানান, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে এনজো ফার্নান্দেজ সমতাসূচক গোল করার পর তিনি এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন যে, অনুষ্ঠানের ভিডিও ধারণের দায়িত্বই ভুলে যান।

তার মতে, সেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সম্মিলিত উল্লাস ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

চিরন্তন ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা

বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহু পুরোনো। বিশ্বকাপ চলাকালে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে খুনসুটি, বিদ্রূপ ও আবেগঘন প্রতিক্রিয়া প্রায়ই দেখা যায়। আর্জেন্টিনা গোল হজম করলে ব্রাজিল সমর্থকদের উচ্ছ্বাস যেমন চোখে পড়ে, তেমনি আর্জেন্টিনার সাফল্যে উল্লাসে মেতে ওঠেন তাদের সমর্থকেরাও। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের বিশ্বকাপ সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।



banner close
banner close