নতজানু পররাষ্ট্রনীতির অবসান নতুন যুগে বাংলাদেশ। দিল্লি যাবেন না প্রধানমন্ত্রী; কীভাবে দেখছে সাধারণ মানুষ? দিল্লির ফাঁদে পা না দিয়ে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিলেন তারেক রহমান। অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ এবং সর্বোপরি ভূ-রাজনীতির এক নতুন সমীকরণ দেখছে বাংলাদেশ। বিগত সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মেরুদণ্ডসম্পন্ন এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আপাতত ভারত সফরে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত ১৫ বছর ধরে দিল্লিকে খুশি করার যে অলিখিত নিয়ম চালু ছিল, তা ভেঙে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে বেছে নিয়েছেন মালয়েশিয়া ও চীনকে। আর তাতেই, মায়াকান্না করছে দিল্লি।
পানিবণ্টন চুক্তিতে টালবাহানা, সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি, শেখ হাসিনাকে ইস্যু করে চাপ প্রয়োগ, সব মিলিয়ে যেন ভারতের অযাচিত খবরদারির কড়া জবাব দিচ্ছে ঢাকা। এর পাশাপাশি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের একমাত্র জীবিত সাক্ষী ও ভারতীয় চর মেজর মোজাফফরের গ্রেপ্তারের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষও বলছেন, ভারতের সাথে আর কোনো গোলামি বা দাসত্বের সম্পর্ক তারা মানবে না।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেয়ার পর সবার চোখ ছিল তার প্রথম বিদেশ সফরের দিকে। নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে আমন্ত্রণপত্রও এসেছিল। রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা ছিল, প্রধানমন্ত্রী হয়তো প্রথা মেনে সবার আগে দিল্লিই যাবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে, জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে রেখে ভারতের সেই পাতা ফাঁদে পা দেননি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
চলতি বছর প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ বলে জানা গেছে। সরকারপ্রধানের সফরের জন্য দুই দেশের মধ্যে যে আস্থার সম্পর্ক থাকা দরকার, এই মুহূর্তে তার ছিটেফোঁটাও নেই বলে আলোচনা উঠেছে। ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নে ঢাকার অনুরোধে দিল্লির নীরবতা, সীমান্তে পুশইন, এবং সবশেষ শেখ হাসিনাকে মাঠে নামিয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ভারতীয় ব্লু-প্রিন্টই এই দূরত্বের মূল কারণ বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, বর্তমান প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে পেছনের দিকে তাকাতে হবে। বিগত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনার সরকার ভারতের ইশারা বা অনুমতি ছাড়া কার্যত কিছুই করত না। ভারত সফরে যাওয়া তাদের কাছে এক ধরনের নিয়মে পরিণত হয়েছিল। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে, ট্রানজিট থেকে শুরু করে অসম চুক্তির মাধ্যমে ভারতের একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করতে সহায়তা করেছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু, দাবি উঠেছে সেই দাসত্ব আর গোলামির শৃঙ্খল থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসেছেন তারেক রহমানের সরকারের।
দিল্লির ছড়ি ঘোরানোর দিন শেষ করে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যেন প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, কারও অঙ্গরাজ্য নয়। দিল্লিকে পাশ কাটিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছুটেছেন মালয়েশিয়া ও চীনে। আর এই সফরগুলো থেকে এসেছে কূটনৈতিক নানা সাফল্য। মালয়েশিয়া সফরে প্রধানমন্ত্রী শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কই জোরদার করেননি, বরং বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আধুনিকায়নে বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছেন, যা দেশের সামরিক নিরাপত্তায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক জটিলতা কাটিয়ে মালয়েশিয়ার বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালুর মতো বড় সুখবর নিয়ে এসেছেন তিনি, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ভূমিকা রাখবে।
এরপরই তিনি যান চীনে। প্রধানমন্ত্রীর এই বেইজিং সফর ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন এক কৌশলগত ভিত্তি তৈরি করেছে বলেই মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তারেক রহমানের সরকারের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ চীন প্রত্যাখ্যান করবে। মোংলা বন্দরের উন্নয়ন ও তিস্তা প্রকল্পে চীনের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনায় কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকরা।
কূটনৈতিক এই টানাপোড়েনের মাঝেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও গোয়েন্দা মহলে বোমা ফাটিয়েছে একটি চাঞ্চল্যকর গ্রেপ্তারের খবর। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের একমাত্র জীবিত সাক্ষী ও অভিযুক্ত ব্যক্তি মেজর মোজাফফরকে বনানী ডিওএইচএস থেকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
জনপ্রিয় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন তার এক ভিডিও বার্তায় একে ভারতের বিরুদ্ধে পরোক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা বলে আখ্যা দিয়েছেন। ইলিয়াস হোসাইন দাবি করেন, মোজাফফর নিজের নাম বদলে 'জয় ব্যানার্জি' বা 'বিপ্লব সরকার' পরিচয়ে ভারতে আত্মগোপনে ছিল এবং পরবর্তীতে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে নিরাপদে রাখা হয়। ইলিয়াস হোসাইনের মতে, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড, জেনারেল মঞ্জুর হত্যা থেকে শুরু করে পিলখানা ট্র্যাজেডি-সবকিছুর পেছনে ভারতের সরাসরি ইন্ধন ছিল।
এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারতে না যাওয়াটা দেশের জন্য ভালো বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। সেইসাথে, বিকল্প রাস্তা খুঁজে বের করা প্রয়োজন বলেও মনে করেন এই অনুসন্ধানী সাংবাদিক।
সরকারের এই বলিষ্ঠ অবস্থান ও ভারতের চাপ এড়িয়ে চলার নীতির প্রশংসা করেছে সাধারণ মানুষও। বিষয়টি নিয়ে, প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা ভারতের খবরদারি তারা আর মেনে নেবে না বলেও মন্তব্য করে।
দিল্লিকে আপাতত দূরে সরিয়ে রেখে নতুন সরকার এখন দৃষ্টি দিচ্ছে বিশ্বমঞ্চে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছে, আগামী সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউ ইয়র্ক যাবেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগেই তার সম্ভাব্য জাপান ও সৌদি আরব সফর নিয়ে জোর প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আগামী ১২ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশ-জাপান পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফরের রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে সৌদি সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। খুব শিগগিরই সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের ঢাকা সফর বা নিউ ইয়র্কে বৈঠকের মাধ্যমে এই সফরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত নিশ্চিতভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, কিন্তু সেই প্রতিবেশীর কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত আস্থার পরিবেশ না পেয়ে বাংলাদেশ এখন নিজের বিকল্প পথ তৈরি করে নিয়েছে। মালয়েশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা চুক্তি, শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ এবং চীনের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন, প্রমাণ করে যে, ঢাকা এখন আর দিল্লির ওপর নির্ভরশীল নয়। বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ, সবারই এখন একটাই প্রত্যাশা জাতীয় স্বার্থ, আত্মমর্যাদা এবং সমঅধিকারের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশের আগামী দিনের পররাষ্ট্রনীতি। কোনো আধিপত্যবাদ বা দাসত্বের ছায়ায় নয়।
আরও পড়ুন:








