শনিবার

১৮ জুলাই, ২০২৬ ৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনায় বিএমইউতে ১০ জন অধ্যাপক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ১৫:২৫

আপডেট: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ১৫:২৮

শেয়ার

রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনায় বিএমইউতে ১০ জন অধ্যাপক
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) সক্রিয় শিক্ষকতার বাধ্যতামূলক ন্যূনতম অভিজ্ঞতা ছাড়াই রাষ্ট্রপতির বিশেষ প্রমার্জনার মাধ্যমে ১০ জন সহযোগী অধ্যাপককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। পদোন্নতি পাওয়া সবাই বিএনপি সমর্থক চিকিৎসক সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর নেতা বা সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালায় অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য অন্তত পাঁচ বছরের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক হলেও পদোন্নতিপ্রাপ্তদের কারও দেড় বছর, কারও দুই বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। একই ধরনের আরও ৩৮ জনের ফাইল রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন পদোন্নতিপ্রাপ্তদের একজন।

গত (১২ এপ্রিল) স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির অন্যতম প্রধান শর্ত সক্রিয় শিক্ষকতার সময়সীমা রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনার মাধ্যমে মওকুফ করার কথা উল্লেখ করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের শেখ ফরহাদ, এরফানুল হক সিদ্দিকী, মো. আশরাফুল ইসলাম ও মুহাম্মদ আব্দুল আউয়াল, শিশু সার্জারি বিভাগের এ এম শাহীনূর, ইউরোলজি বিভাগের মোহাম্মদ আবদুস সালাম ও মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ফিটোমেটারনাল মেডিসিন বিভাগের উম্মে কুলসুম, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগের মো. জাহিদুর রহমান এবং শিশু নিউরোলজি বিভাগের কাজী আশরাফুল ইসলাম।

নিয়ম ভাঙার অভিযোগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, একাডেমিক যোগ্যতার অন্যতম প্রধান শর্ত মওকুফ করে রাতারাতি অধ্যাপক বানিয়ে দেওয়ার ঘটনা সম্পূর্ণ নজিরবিহীন। তার মতে, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের ফল।

শিক্ষাবিদ এম ওয়াহিদুজ্জামানও এ পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে বেআইনি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বা সংবিধানের কোথাও রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতির শর্ত শিথিল করার কোনো বিধান নেই। তার ভাষায়, এটি গায়ের জোরে করা হয়েছে এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত অপরাধ।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য

শর্ত পূরণ না করার পরও কেন পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন সরাসরি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তিনি বলেন, তিনি প্রচলিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসারেই দায়িত্ব পালন করেন। সাংবিধানিক ব্যবস্থায় যেখানে স্বাক্ষর করা প্রয়োজন, সেখানে স্বাক্ষর করেন। এর বাইরে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না।

রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, তার কাছে মূলত আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের বিষয়টি আসে এবং সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই পাঠায়। কোন ফাইল কখন নিষ্পত্তি করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।

পদোন্নতির পর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

আরেকটি নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে পদোন্নতির প্রায় দেড় মাস পর, সোমবার (১ জুন) বিএমইউ নিয়মিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

ওই বিজ্ঞপ্তিতে অধ্যাপক পদের যোগ্যতায় উল্লেখ করা হয়, প্রার্থীকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপক্ষে পাঁচ বছর এবং স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানে মোট ১০ বছরের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। পাশাপাশি কমপক্ষে ১২টি গবেষণা প্রকাশনা বাধ্যতামূলক রাখা হয়।

পদোন্নতিপ্রাপ্তদের ব্যাখ্যা

বিএমইউর প্রক্টর ও পদোন্নতিপ্রাপ্ত শেখ ফরহাদ বলেন, পদোন্নতিপ্রাপ্তদের কারওই নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছরের সক্রিয় শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা নেই। তবে তারা ২০১০ কিংবা ২০১২ সালে এমএস বা উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন। অনেকেই দীর্ঘ সময় মেডিকেল অফিসার বা কনসালট্যান্ট হিসেবেই কর্মরত ছিলেন।

তার দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাদের দীর্ঘদিন পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তাদের অনেক ছাত্রও ইতোমধ্যে অধ্যাপক হয়েছেন। যারা অভিজ্ঞতার প্রশ্ন তুলছেন, তারা এত বছর পদোন্নতি না হওয়ার কারণও বিবেচনায় নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ড্যাবের নেতাদের পদ

২০২৫ সালের মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ড্যাবের ২৭৬ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ৫৭ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন দেওয়া হয়।

পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে এরফানুল হক সিদ্দিকী ড্যাবের বিএমইউ শাখার সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি। শেখ ফরহাদ বিএমইউ শাখার সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব। মুহাম্মদ আব্দুল আউয়াল বিএমইউ শাখার কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বিএমইউ শাখার সহসভাপতি এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক। মো. আবদুস সালাম বিএমইউ শাখার সাবেক সভাপতি ও বর্তমান কমিটির এক্স-অফিসিও সদস্য। এ এম শাহীনূর কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং আশরাফুল আলম মানিক সহআন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক। উম্মে কুলসুম, মো. জাহিদুর রহমান ও কাজী আশরাফুল ইসলাম ড্যাবের আজীবন সদস্য।

তবে ড্যাবের কেন্দ্রীয় সভাপতি হারুন আল রশীদ দাবি করেন, এ প্রমার্জনার জন্য সংগঠন হিসেবে তারা কোনো তদবির করেননি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই ব্যক্তিগত অবস্থান বিবেচনা করে ফাইল রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে পদোন্নতি পাওয়া অনেক চিকিৎসক ২০০২ বা ২০০৩ সালে চাকরিতে যোগ দিয়েও দীর্ঘ সময় মেডিকেল অফিসার হিসেবেই থেকে গেছেন। তাদের পরে চাকরিতে যোগ দেওয়া অনেকে অধ্যাপক হয়েছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর বঞ্চিত থাকার পর তারা সুযোগ পেয়ে আবেদন করেছেন। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রমার্জনার আবেদন করা হয়ে থাকলে তা বিশেষ বিবেচনায় গ্রহণ করা যৌক্তিক। তবে অতীতে এ ধরনের প্রমার্জনার কোনো প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি।

আরও ৩৮ জনের ফাইল প্রস্তুত

শেখ ফরহাদ বলেন, একই ধরনের আরও ৩৮ জনের ফাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯২তম সিন্ডিকেট সভায় রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনার জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তার ভাষ্য, সামনে আরও যাদের পদোন্নতি হবে এবং যাদের ক্ষেত্রে শুধু সক্রিয় শিক্ষকতার ঘাটতি থাকবে, তাদের ক্ষেত্রেও একইভাবে রাষ্ট্রপতির প্রমার্জনা চাওয়া হবে।

প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, পদোন্নতি বোর্ডে উপাচার্য, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিন, বিভাগীয় চেয়ারম্যান বা জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বহিরাগত বিশেষজ্ঞ এবং রেজিস্ট্রারসহ মোট ১০ সদস্য থাকেন।

মন্ত্রণালয়ের অবস্থান

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেন এভাবে পদোন্নতির শর্ত শিথিলের প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়েছে, সে বিষয়ে বোর্ড কমিটির প্রধান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এফ এম সিদ্দিকী বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জানান, কোনো পত্রিকার সঙ্গে উপাচার্য কথা বলেন না এবং আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারের জন্যও কোনো ব্যবস্থা নেই।

পরে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন অনুবিভাগ) এস এম আহসানুল আজিজ বলেন, সরকারের বিধান অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থ ও একাডেমিক স্বার্থ বিবেচনায় প্রমার্জনা করতে পারে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্টরা অন্যান্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও মানদণ্ড পূরণ করলে তা নিয়ে সমস্যার কথা নয়।

তিনি বলেন, তার ধারণা প্রয়োজনীয় সব মানদণ্ড বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারবেন না।

একাডেমিক মান নিয়ে উদ্বেগ

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, এ চিকিৎসকেরা পরবর্তীতে থিসিস সুপারভাইজার বা পরীক্ষক হলে তাদের একাডেমিক যোগ্যতা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এটি দেশের উচ্চশিক্ষা ও চিকিৎসা শিক্ষার জন্য ক্ষতিকর হবে।

তিনি আরও বলেন, অধ্যাপক কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পদ নয়। এটি দীর্ঘ শিক্ষকতা, গবেষণা ও একাডেমিক নেতৃত্বের স্বীকৃতি। পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছাড়াই কাউকে এ পদে বসানো হলে তার নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষার্থী ও রোগীদের ওপর পড়বে।

ওই অধ্যাপকের দাবি, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঞ্চনার অজুহাত তুলে অনেককে মেডিকেল অফিসার থেকে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করিয়ে মাত্র দেড় বছরের মাথায় সহযোগী অধ্যাপক করা হয়েছে।



banner close
banner close