উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রফতানি আয় কমে যাওয়া, ব্যাংক খাতের ঝুঁকি, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট, উচ্চ সুদহার, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতির কারণে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে। এর মধ্যে নতুন অর্থবছরের বাজেটে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ বাতিল এবং ফ্ল্যাটের সরকারিভাবে নির্ধারিত মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপ করায় দেশের অন্যতম বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ খাত আরও সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, আবাসন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দুই কোটি মানুষ যুক্ত। সরাসরি যুক্ত রয়েছেন প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। এ খাত আরও স্থবির হলে তিন শতাধিক ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা সহযোগী শিল্প এবং মোট ৪৫৮টি উপখাতও ঝুঁকিতে পড়বে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখা এ খাতের সংকট বাড়লে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিনিয়োগে স্থবিরতা, অর্থনীতিতে চাপ
প্রদত্ত তথ্যে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। একই সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ৪৮ দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। রফতানি, রেমিট্যান্স ও বিদেশি বিনিয়োগে উৎসাহ বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং রাজউকের নীতিগত জটিলতা ও হয়রানির কারণে আবাসন ব্যবসায়ীরা সংকটে রয়েছেন। নতুন বাজেটে অতিরিক্ত কর আরোপ এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সময়ে দেশে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ায় বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যেখানে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সংকট সবচেয়ে বেশি।
এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতায় বাড়ছে উদ্বেগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পর বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন-সুবিধার নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা হারানো, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়া, ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, রফতানিতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কার মধ্যে সরকার জাতিসংঘের কাছে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। এ সময়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মত
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দ্রুত অর্থনৈতিক সংস্কার, বাণিজ্য চুক্তি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় রফতানি ও বিনিয়োগ বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারি ও বেসরকারি—কোনো খাতেই প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান হচ্ছে না। তাঁর মতে, বেকারত্ব বৃদ্ধির মূল কারণ বিনিয়োগের ঘাটতি। বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়বে।
অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম বলেন, আবাসন খাত সহজ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। তাঁর মতে, এ খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০০ উপখাত বর্তমানে ঝুঁকিতে রয়েছে এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে খাতটিকে চাঙ্গা রাখা প্রয়োজন।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের কারণে আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে স্থবির। ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে নির্মাণসামগ্রীর দাম গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে এবং ব্যাংকঋণের সুদহার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছেছে। তাঁর মতে, নতুন ১৫ শতাংশ কর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।
রফতানি, রেমিট্যান্স ও রাজস্বেও চাপ
প্রদত্ত তথ্যে বলা হয়েছে, জুন ২০২৬-এ দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২ দশমিক ৮০৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের ২ দশমিক ৮২৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কম। একই সময়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রফতানি হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন বা চার হাজার আট কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০ কোটি ডলার বা শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। গ্যাসসংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা শিল্প ও রফতানি খাতে চাপ সৃষ্টি করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা। আদায় হয়েছে চার লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। এতে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, আবাসন খাতের ওপর নতুন কর আরোপ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিবর্তে ভবিষ্যতে ঘাটতি আরও বাড়াতে পারে।
আবাসন খাতে নীতিসহায়তার আহ্বান
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত, যার অন্যতম আবাসন শিল্প। তাঁর মতে, এ খাত মন্দায় আক্রান্ত হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই দেশীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে আবাসন খাতে প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
আরও পড়ুন:








