শনিবার

১৮ জুলাই, ২০২৬ ৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩

১৮ জুলাই মীর মুগ্ধের মৃত্যু কাঁদায় বাংলাদেশকে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬ ০৭:৫০

শেয়ার

১৮ জুলাই মীর মুগ্ধের মৃত্যু কাঁদায় বাংলাদেশকে
ছবি সংগৃহীত

ফিরে দেখা জুলাই; এদিন প্রাণহানি, অগ্নিসংযোগে স্থবির হয়ে পড়ে দেশ। রক্তাক্ত ১৮ জুলাই। কমপ্লিট শাটডাউন ঘিরে দেশজুড়ে সংঘর্ষ, প্রাণহানি, অগ্নিসংযোগ ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন।

১৬ জুলাই আবু সাঈদসহ ছয়জন নিহত হওয়ার পর ১৭ জুলাই গায়েবানা জানাজা, কফিন মিছিল এবং ‘কমপ্লিট শাটডাউন’-এর ঘোষণা আসে। সেই ঘোষণার বাস্তব রূপ দেখা যায় ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই)। আন্দোলনের সবচেয়ে রক্তাক্ত দিনগুলোর একটিতে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের হামলায় সাংবাদিকসহ অন্তত ৩১ জন আন্দোলনকারী শহীদ হন।

নিহতদের মধ্যে ঢাকায় ২৪ জন, চট্টগ্রাম ও নরসিংদীতে দুজন করে এবং রংপুর, সাভার ও মাদারীপুরে একজন করে প্রাণ হারান। এদের মধ্যে অন্তত ১১ জন শিক্ষার্থী ছিলেন। বিভিন্ন স্থানে আহত হন প্রায় দেড় হাজার মানুষ। ১৬ জুলাইয়ের ছয়জন নিহতকে যুক্ত করলে আন্দোলনে শহীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ জনে।

এদিন পূর্বঘোষিত কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারাদেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২২৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। একইসঙ্গে ডিএমপি অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজধানীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

বেলা ১২টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঢাকার সঙ্গে দেশের অধিকাংশ জেলার রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আর রাত ৯টার পর সারাদেশে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দেয় স্বৈরাচারী সরকার।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে হানিফ ফ্লাইওভারের টোল প্লাজায় আগুন দেয়া হয়। যাত্রাবাড়ী, কাজলা, শনির আখড়া, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে আন্দোলনকারীরা। মিরপুর-১০ গোলচত্বরে মেট্রোরেলের নিচে ফুটওভারব্রিজের পুলিশ বক্সে প্রতিবাদের ঢেউ পৌঁছে যায়। পরিস্থিতির কারণে মেট্রোরেল চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়।

উত্তরায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ করে তৎকালীন পুলিশ ও র‍্যাববাহিনী। কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট ও গুলি ছোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। একপর্যায়ে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটিতে অবস্থান নেয়া পুলিশ ও র‍্যাব সদস্যদের আন্দোলনকারীরা ঘিরে ফেললে পরে হেলিকপ্টারে করে তাদের সরিয়ে নেয়া হয়।

এদিন উত্তরায় শহীদ হন শিক্ষার্থী মীর মুগ্ধ। পানি লাগবে পানি বলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করা মুগ্ধের করুণ মৃত্যু নাড়িয়ে দেয় গোটা দেশের মানুষের বিবেক।

এছাড়া রাজধানীর মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, ধানমন্ডি, মিরপুর-১০, নীলক্ষেত, আজিমপুর, তেজগাঁও, শান্তিনগর, মহাখালী, শনির আখড়া, কাজলা ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা দিনভর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। একই দিনে রাজধানীর রামপুরায় বিটিভি ভবন, মহাখালীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, ডাটা সেন্টার ও সেতু ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া মিরপুর, মহাখালী, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ বক্স, উত্তরা-পূর্ব থানাসহ একাধিক স্থাপনায় প্রতিবাদের আঁচ পাওয়া যায়।

রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলাতেও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় হাসিনার পেটুয়া পুলিশ বাহিনী। অনেক জায়গায় পুলিশের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ করে। এদিন দেশের ৪৭ জেলায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহের কথা জানান। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, শহীদের রক্তের ওপর কোনো সংলাপ হবে না। একইসঙ্গে ১৯ জুলাইও শাটডাউন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং জুমার নামাজের পর গায়েবানা জানাজার ঘোষণা দেন তিনি।

এদিন সন্ধ্যায় কোটা বহাল সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের লিভ টু আপিল শুনানির জন্য ২১ জুলাই দিন ধার্য করে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত।

অন্যদিকে ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের শতাধিক নেতা-কর্মী পদত্যাগ করে। দেশের বিভিন্ন জেলাতেও আরও অন্তত ২৪ জন নেতা-কর্মী সংগঠন ছাড়ার ঘোষণা দেয়।

আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সময়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সহিংসতার জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করেন। আর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়েছে।

১৮ জুলাইয়ের কমপ্লিট শাটডাউন শুধু একটি কর্মসূচি ছিল না; এটি আন্দোলনকে নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে যায়। প্রাণহানি, সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, রাষ্ট্রীয় কঠোরতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি রক্তাক্ত এক অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নেয়। সেইসাথে মীর মুগ্ধের মৃত্যু কাঁদায় পুরো বাংলাদেশকে।



banner close
banner close