শুক্রবার

১৭ জুলাই, ২০২৬ ২ শ্রাবণ, ১৪৩৩

১৭ জুলাই: হাসিনা নিজেও জানতেন না এটাই জাতির উদ্দেশে তার শেষ ভাষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ জুলাই, ২০২৬ ০৭:৪৬

শেয়ার

১৭ জুলাই: হাসিনা নিজেও জানতেন না এটাই জাতির উদ্দেশে তার শেষ ভাষণ
ছবি সংগৃহীত

হাসিনা নিজেও জানতেন না এটাই জাতির উদ্দেশে তার শেষ ভাষণ। বুধবার (১৭ জুলাই) উত্তাল দিন। গায়েবানা জানাজা ঘিরে সংঘর্ষ, হল ছাড়ার নির্দেশ এবং কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণা।

জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিনগুলোর একটি। এই দিন সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন হয়তো তিনিও জানতেন না এটাই হবে জাতির উদ্দেশে তার শেষ ভাষণ। ভাষণে তিনি নাটকীয় ভঙ্গিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়ে বলেন তার বিশ্বাস শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার পাবে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই।

কিন্তু হাসিনার সেই ভাষণের আগেই সারাদেশে ছিল উত্তপ্ত পরিস্থিতি। আগের দিন রংপুরে জুলাইয়ের প্রথম শহীদ আবু সাঈদসহ ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পবিত্র আশুরার সরকারি ছুটির দিনেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গায়েবানা জানাজা কফিন মিছিল সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ এবং দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

আগের দিন সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগ ও পুলিশের হামলায় নিহতদের স্মরণে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয় বুধবার (১৭ জুলাই)। তবে কর্মসূচি শুরুর আগেই পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে বিকেল চারটার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজা শেষে শিক্ষার্থীরা প্রতীকী কফিন হাতে শপথ নেয় দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবে। এরপর তারা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে টিএসসি অভিমুখে যাওয়ার চেষ্টা করলে আবারও সংঘর্ষ বাধে। দীর্ঘ সময় অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দেয় আন্দোলনকারীরা।

এসময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক সারজিস আলম বলেন ক্যাম্পাসের প্রতিটি প্রবেশপথ বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি ছোড়া হয়েছে।

একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নির্দেশনায় দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্যাম্পাস ও আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করে। সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পর অনেক শিক্ষার্থী হল ছাড়লেও অনেকে সেই নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসে অবস্থান করে।

বিকেলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ টিএসসি এলাকায় গিয়ে হুমকি দেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হল না ছাড়লে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এর আগে ১৬ জুলাই রাতভর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে প্রতিবাদ জানিয়ে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বের করে দেয় আন্দোলনকারীরা। কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। একই সঙ্গে ১৪টি হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের অঙ্গীকারনামায় প্রাধ্যক্ষদের স্বাক্ষর নেয়া হয়। আন্দোলনকারীরা ক্যাম্পাসকে ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ঘোষণা করে।

একই সময় সরকার ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইন্টারনেট সেবা সীমিত বা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।

রাজধানীতে দিনভর উত্তেজনার মধ্যে কাজলা অংশে মেয়র হানিফ উড়ালসড়কের টোল প্লাজায় আগুন দেয়া হয়। শনির আখড়া থেকে কাজলা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে মধ্যরাত পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দেখা যায়।

দিনের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ১৮ জুলাই বৃহস্পতিবার সারাদেশে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করে। হাসপাতাল ও জরুরি সেবা ছাড়া সবকিছু বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়।

রাত আটটার দিকে ফেসবুকে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি দেশের সব স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানান।

এদিকে স্বৈরাচারী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ষড়যন্ত্র করে বলেন কোটা সংস্কার আন্দোলন স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে চলে গেছে।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও দলীয় নেতাকর্মীদের উসকানি দিয়ে বলেন তাদের অস্তিত্বের ওপর হামলা এসেছে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেই হবে।

এদিন সকালে রংপুরের পীরগঞ্জে নিজ গ্রামে দাফন করা হয় জুলাইয়ের প্রথম শহীদ আবু সাঈদকে। একই দিনে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নিহতদের স্মরণে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করলে সেখানে পুলিশ বাধা দেয়। পরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন সরকার আলোচনার পথ না নিয়ে দমন-পীড়নের পথ বেছে নিয়েছে।

চট্টগ্রামেও বিকেলে লালদীঘি ময়দানে হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি সড়ক-মহাসড়ক এবং দুটি রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ চালিয়ে যায় আন্দোলনকারীরা।

বুধবার (১৭ জুলাই) য়ের শেষে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একদিকে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার জাতির উদ্দেশে শেষ ভাষণ অন্যদিকে গায়েবানা জানাজা হল খালি করার নির্দেশ এবং কমপ্লিট শাটডাউন-এর ঘোষণায় আন্দোলন পরদিন আরও বড় পরিসরের দিকে এগিয়ে যায়।



banner close
banner close