বৃহস্পতিবার

১৬ জুলাই, ২০২৬ ১ শ্রাবণ, ১৪৩৩

সর্বশেষ
২০ জুলাই থেকে টানা ভারী বৃষ্টির আভাস, ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত সমুদ্রবন্দরে '১২ কোটি শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিয়েছি' মন্তব্য করে ভাইরাল হওয়া সুহি মাইলস্টোন কলেজের ছাত্রী নয় ভারতের নীলনকশা ধরে ফেলাতেই লেলিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে? জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জামায়াত নেতা মাওলানা আব্দুল হালিমের ১৬ জুলাই: আবু সাঈদের আত্মত্যাগে রচিত জুলাইয়ের মহাকাব্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে সরকারের ৪৫২৭ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা নবম ওয়েজ বোর্ড ছাড়া সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা সম্ভব নয়: তথ্যমন্ত্রী ঐক্যবদ্ধ থেকে সংকট মোকাবিলার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ভারতের নীলনকশা ধরে ফেলাতেই লেলিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬ ২১:৩৪

শেয়ার

ভারতের নীলনকশা ধরে ফেলাতেই লেলিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে?
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে গেছেন হাসিনা; পরীক্ষা দিতে অনীহা শিক্ষার্থীদের। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ষড়যন্ত্র। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করতে চাওয়াতেই তোপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী?

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা শুধু আলোর প্রদীপই নয়, এটি একটি জাতি ও দেশের মূলভিত্তি। মেরুদণ্ডহীন মানুষ যেমন চিরস্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে, তেমনি শিক্ষা ছাড়া একটি জাতি ও দেশও চিরকালের জন্য অচল হয়ে পড়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত যখন অনুধাবন করলো যে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নড়বড়ে করতে হলে আগে ভেঙে দিতে হবে তার শিক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড, তখনই তারা নেমে পড়ে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী চক্রান্তে। এমন হিসাব কষেই শুরু হয় এক অদৃশ্য আঘাত।

তাদের মতে, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে ধীরে ধীরে বোনা হতে থাকে ষড়যন্ত্রের এক অদৃশ্য, ঘন কালো মায়াজাল। এই জাল একদিনে বোনা হয়নি; বরং এটি দীর্ঘ প্রায় ৮০ বছরের একটি সুপরিকল্পিত, মুসলিমবিরোধী বৃহৎ মহাপরিকল্পনার অংশ। আর সেই মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের দায়িত্ব যেন এসে পড়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের হাতে।

জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর, পরিস্থিতিতে আসে নাটকীয় পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের চতুর্মুখী পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে শুরু করে এবং বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে গড়ে ওঠা কথিত ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিএনপি সরকার গঠনের পর স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আর আগের মতো বাইরের প্রভাবনির্ভর কাঠামোয় পরিচালিত হচ্ছে না। বরং, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে যে কথিত চতুর্মুখী চক্রান্তের রূপরেখা তৈরি হয়েছিল, তা প্রকাশ্যে আনতে শুরু করেছে বর্তমান সরকার। সম্প্রতি, একটি ভিডিওতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার একটি পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিল।

জানা যায়, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী এহসানুল হক মিলন ফ্যাসিস্ট সরকারের রেখে যাওয়া গুণগত মানহীন শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর করতে নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এক কনফারেন্সে তাকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার ওপর জোর দিতে দেখা যায়।

এছাড়াও, যেকোনো পরীক্ষার হলে কড়া নজরদারি করার নির্দেশ দেন শিক্ষামন্ত্রী। পরীক্ষাকেন্দ্রকে নকলমুক্ত রাখতে তিনি বিশেষভাবে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। এমনকি নকল ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

এসএসসি পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষামন্ত্রীর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। সেই ভিডিওতে তাকে হঠাৎ একটি পরীক্ষার হলে উপস্থিত হতে দেখা যায় এবং নকল করার অভিযোগে এক শিক্ষার্থীর খাতা বাজেয়াপ্ত করতেও দেখা যায়। এ ঘটনার পক্ষে বিপক্ষে দেশজুড়ে তৈরি হয় আলোচনা-সমালোচনা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষামন্ত্রীর এসব কঠোর পদক্ষেপের ফলেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আন্দোলনে নেমেছে। তাদের মতে, ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া ঢিলেঢালা পরীক্ষা পদ্ধতি ও সহজ সিলেবাস থেকে এখনো অনেক শিক্ষার্থী পুরোপুরি বের হতে পারেনি। ফলে, কঠোর পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে গিয়ে তারা সমস্যায় পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে অনেক শিক্ষার্থীকে বলতে দেখা যায়, পরীক্ষা কঠিন হওয়ায় তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছে।

অভিযোগ উঠেছে, ভারত বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ভিত্তি ধ্বংস করার জন্য ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে তার দাবার ঘুঁটি হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর ব্যবহার করেছে। এবং ভারতের তথাকথিত ‘প্রেসক্রিপশন’ বাস্তবায়নের জন্যই শেখ হাসিনা সময়ে সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষাক্রমে বিতর্কিত পরিবর্তন এনেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, কখনো সিলেবাস থেকে মহানবী (সা.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী, হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.)-এর জীবনী বাদ দেওয়া হয়েছে; আবার কখনো বাংলা পাঠ্যপুস্তকে রামায়ণের সংক্ষিপ্ত রূপ এবং দেবী দুর্গার প্রশংসাসূচক কবিতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এছাড়াও, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তৈরি শিক্ষাব্যবস্থার নানা অব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। সংশ্লিষ্টরা জানায়, শিক্ষার্থীরা বাংলা, গণিত ও ইংরেজিতে ভালো করলেও কেউ যদি নাটক, নৃত্য ও সংগীতে ভালো করতো, তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো, যা নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। এ নিয়ে সে সময় অভিভাবকদের আন্দোলন করতেও দেখা যায় এবং তারা শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

অন্যদিকে, ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের উন্নত শিক্ষার পরিবর্তে ডিম ভাজি, ভাত রান্না করা, ঘুম থেকে উঠে কাঁথা-বালিশ গোছানো শেখানো নিয়েও তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এসব বিষয়কে শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করায় তৎকালীন সরকারকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।

পাঠ্যপুস্তকে রান্না বা গৃহস্থালি কাজ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অনেক শিক্ষার্থীই বলে, এসব বিষয় তারা পরিবার থেকেই সহজে শিখতে পারে, এর জন্য আলাদা করে পাঠ্যবইয়ের প্রয়োজন নেই।

অপরদিকে, ফ্যাসিবাদী আমলে শিক্ষকদের ভূমিকা ও প্রশিক্ষণ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের নামে বিভিন্ন অপ্রাসঙ্গিক ও হাস্যকর কার্যক্রম করানো হতো, যা শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করেছে। এমনকি ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা, একসঙ্গে নৃত্য বা হাস্যরসাত্মক কর্মকাণ্ডের ফলে পারস্পরিক সম্মানের দূরত্ব কমে যায়। যার ফলস্বরূপ এমন ঘটনাও সামনে আসে, যেখানে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের প্রতি অসম্মানজনক আচরণ করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ হাসিনার শিক্ষা কার্যক্রম ও অব্যবস্থাপনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ। তাদের দাবি, এটি একটি এমন নীতির বাস্তবায়ন, যা একটি জাতিকে আর্থিক, প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামোগতভাবে দুর্বল করে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

অন্যদিকে, বর্তমান বিএনপি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী এসে সেই পরিকল্পনাগুলো ভেস্তে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, এমনটিও দাবি করা হচ্ছে। অনেকের মতে, এই পরিবর্তনের কারণেই শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে আন্দোলনে ব্যবহার করা হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে।

বিশ্লেষকরা বলছে, বাংলাদেশকে যদি কোনো ভারতীয় প্রভাব বা তথাকথিত ‘প্রেসক্রিপশন’ থেকে মুক্ত করতে হয়, তবে শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজাতে হবে। একটি আধুনিক, যুগোপযোগী, মূল্যবোধনির্ভর এবং বাস্তবমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভরশীল ও উন্নত জাতি গঠনের পথ সুগম হবে।



banner close
banner close