বাংলাদেশের চারটি চলমান উন্নয়ন প্রকল্প থেকে মোট ১১ হাজার ৬৬২ কোটি টাকার প্রতিশ্রুত ঋণ প্রত্যাহার করেছে ভারত। গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নেওয়া এ সিদ্ধান্ত নিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্কের প্রভাবের আলোচনা থাকলেও, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুই দেশের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই ঋণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানায়, ঋণ প্রত্যাহারের ফলে একটি প্রকল্পে চীনের অর্থায়নে নতুনভাবে কাজ শুরু হচ্ছে, আরেকটির জন্য বিকল্প অর্থায়নের চেষ্টা চলছে এবং বাকি দুটি প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।
ইআরডির সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী বলেন, রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক টানাপড়েনের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি ধীর ছিল। পরে উভয় পক্ষের সম্মতিতেই ঋণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একতরফাভাবে কোনো পক্ষের ঋণ বাতিলের সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ঋণ প্রত্যাহার হওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পার্বতীপুর-কাউনিয়া রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর প্রকল্প। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৬৮৩ কোটি ২১ লাখ টাকা, যার মধ্যে ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) থেকে আসার কথা ছিল ১ হাজার ৩৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হলেও কাজ সম্পূর্ণ হয়নি এবং এটি বাতিলের চিন্তা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া খুলনা-দর্শনা ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারতীয় ঋণের অংশ ছিল ২ হাজার ৬৮৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এই অর্থও প্রত্যাহার করায় বর্তমানে বিকল্প অর্থায়নের উৎস খোঁজা হচ্ছে।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে ভারতীয় এলওসি-৩ থেকে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও ২০২৫ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত এলওসি পর্যালোচনা সভায় প্রকল্পটি ওই অর্থায়ন কাঠামো থেকে বাদ দেওয়া হয়। পরে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কারণে প্রকল্পের মেয়াদ ২০৩০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে এবং ব্যয় বেড়ে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ২৭ দশমিক ৭১ শতাংশ।
প্রকল্প পরিচালক মো. আবু জাফর মিয়া বলেন, ভারতীয় ঋণের পরিবর্তে এআইআইবির অর্থায়ন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নতুন অর্থায়নে ওভারপাস নির্মাণ, আটটি স্টেশন নির্মাণসহ অন্যান্য কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
অন্যদিকে আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট প্রকল্পের একটি অংশে ভারতের ৪ হাজার ৪৫৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। ওই অংশের কাজ এখন বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে প্রকল্পের অন্য অংশে চীনের অর্থায়নে কাজ চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, এ সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণ থাকার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাঁর মতে, দুই দেশের বর্তমান সম্পর্ক এবং প্রকল্পগুলোর প্রতি উভয় পক্ষের আগ্রহের পরিবর্তনও এ সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়নের আহ্বান জানান।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানে ভারতের অবদান বর্তমানে প্রায় ২ শতাংশ। ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ভারত প্রায় ৭৯৯ কোটি ৫৩ লাখ মার্কিন ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও ছাড় করেছে ২৬১ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। ফলে প্রতিশ্রুত অর্থ ও প্রকৃত অর্থ ছাড়ের মধ্যে প্রায় ৫৩ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ এখনো পাইপলাইনে রয়েছে।
আরও পড়ুন:








