বুক পেতেছি গুলি কর বুকের ভিতর দারুণ ঝড়। ইতিহাস কখনো কখনো একজন মানুষের ওপর নির্ভর করে মোড় নেয়। একটি মুহূর্ত, একটি সিদ্ধান্ত এবং একটি আত্মত্যাগ পুরো একটি জাতির ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
১৬ জুলাই ২০২৪। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি দিন, যেদিন রংপুরের মাটিতে রচিত হয়েছিল এক নতুন মহাকাব্য।
জুলাই মাস। তীব্র দাবদাহে পুড়ছে দেশ, আর তার চেয়েও বেশি পুড়ছে তরুণ প্রজন্মের হৃদয়। বৈষম্যহীন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্নে, কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবিতে সারা দেশ তখন উত্তাল। ঢাকা থেকে শুরু করে টেকনাফ তেঁতুলিয়া সর্বত্র রাজপথে নেমেছে লাখো শিক্ষার্থী। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র সেই যৌক্তিক দাবি মেটানোর বদলে বেছে নেয় দমনের এক নিষ্ঠুর পথ। ১৬ জুলাই ২০২৪ দুপুর ২টা বেজে ৩০ মিনিটে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পার্ক মোড়ে আন্দোলনরত নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশ এবং তৎকালীন শাসকদলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। নির্বিচারে চলতে থাকে টিয়ারগ্যাস সাউন্ড গ্রেনেড আর রাবার বুলেট।
চারদিকে তখন কেবলই ধোঁয়া বারুদের গন্ধ আর আতঙ্ক।
১৬ জুলাই ২০২৪। ২টা বেজে ৩০ মিনিট। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পার্ক মোড়।
আহসান হাবীব ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
বুক পেতেছি গুলি কর বুকের ভিতর দারুণ ঝড়।
মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ যখন পালাতে ভুলে যায় তখন সে হয়ে ওঠে একটি বারুদ। কালো টি শার্ট গায়ে পুলিশের সামনে বুক টান করে দাঁড়ায় আবু সাঈদ।
আবু সাঈদ এক পা ও পেছালেন না। তিনি ঘাতকের দিকে দুই হাত প্রসারিত করে দিলেন। তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি যেন বলছিল মারো। কত গুলি আছে তোমাদের। আমার ভাই বোনদের গায়ে লাগার আগে আমার বুকে গুলি চালাও।
গুলি চললো। মাত্র ১৫ থেকে ২০ গজ দূর থেকে। কোনো সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি নয় সরাসরি বুক ও মুখমণ্ডল তাক করে শটগানের প্রাণঘাতী গুলি ছুঁড়লো পুলিশ। ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতর পরপর কয়েকবার গুলিবিদ্ধ হয়ে শরীর ঝাঁজরা হয়ে গেল সাঈদের। হাতের লাঠিটি ছিটকে পড়লো আর সেই সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো একটি তরতাজা প্রাণ। একটি স্বাধীন দেশের বুকে রচিত হলো আরেক পরাধীনতার নির্মম উপাখ্যান।
সেখানেই আবু সাঈদ লুটিয়ে পড়ার পরপরই তার সতীর্থদের আর্তনাদ। চারদিক থেকে দৌড়ে আসছে কয়েকজন শিক্ষার্থী।
সিয়াম হোসেন আয়ান সাবেক সমন্বয়ক।
সাজু বাসফোর জুলাই যোদ্ধা।
ফারিদ ইসলাম শিক্ষার্থী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়।
কিন্তু কে ছিলেন এই আবু সাঈদ। কেন তিনি নিজের জীবন এভাবে বিলিয়ে দিলেন।
লাশের হিসাব কে দিবে কোন কোটায় দাফন হবে।
রংপুরের পীরগঞ্জের বাবনপুর গ্রাম। এই গ্রামেরই কৃষক মকবুল হোসেন ও মনোয়ারা বেগমের ছেলে ২৩ বছর বয়সী আবু সাঈদ।
৯ ভাই বোনের মধ্যে সাঈদ ছিলেন সবার ছোট। অভাবের সংসারে তিনি ছিলেন এক টুকরো আলো একবুক আশা। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী সাঈদ টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালাতেন।
আর স্বপ্ন দেখতেন প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা হয়ে দেশের সেবা করার। অভাবের সংসারে জন্ম নেয়া ছেলেটি চাইতেন বৃদ্ধ বাবা মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পরিবারের দুঃখ ঘোচাতে। কিন্তু বিধাতা তার জন্য লিখে রেখেছিলেন এক অন্যরকম মহিমা। তিনি সরকারি কর্মকর্তা হননি ঠিকই কিন্তু তিনি হয়ে গেছেন এমন এক ইতিহাসের রচয়িতা যার কাছে পৃথিবীর সব পদ পদবি সব ক্ষমতা যেন তুচ্ছ।
সাঈদের মা আজও ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদেন। চোখের জল শুকিয়ে গেছে কিন্তু বুকের আগুন নেভেনি।
ছেলের স্মৃতি হাতড়ে হাউমাউ করে কাঁদেন জনম দুখিনি মা। নিজের সন্তানকে ওরা পাখির মতো গুলি করে মেরেছে বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে তার। মানুষের অধিকারের জন্য লড়তে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরা ছেলের হত্যাকারীদের দ্রুত ফাঁসি কার্যকরের দাবি বুক খালি হওয়া এই মায়ের। মনোয়ারা বেগম শহীদ আবু সাঈদের মা।
আবার ছেলের স্মৃতি মনে করেই হাউমাউ করে কাঁদেন শহীদ আবু সাঈদের অসহায় বাবা।
ছেলে হত্যার বিচারের ধীর অগ্রগতি নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন মকবুল হোসেন। ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারেন সেই অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। মকবুল হোসেন শহীদ আবু সাঈদের বাবা।
আবু সাঈদ হত্যার পর পরিবারটিতে নেমে আসে এক কালো অধ্যায়। হত্যার পর মরদেহ গুমের চেষ্টা চালায় তৎকালীন হাসিনার প্রশাসন। এরপর সাঈদের মরদেহ দাফন নিয়েও পরিবারকে নানাভাবে চাপ দিতে থাকে তারা। আবু হোসেন শহীদ আবু সাঈদের ভাই।
হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুরতা এখানেই থেমে থাকেনি। উল্টো সাঈদের বন্ধুদের বিরুদ্ধেই মিথ্যা মামলা দিয়েছিল তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন। শহীদ সাঈদকে বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল অপরাধী।
১৬ জুলাইয়ের আগে কেবল কোটা সংস্কারের দাবি ছিলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের। কিন্তু সাঈদের বুকের রক্ত যখন রাস্তায় পড়লো সেদিনের পর থেকে আন্দোলন রূপ নেয় গণ অভ্যুত্থানে।
আবু সাঈদ মুগ্ধ শেষ হয়নি যুদ্ধ।
আবু সাঈদের এই আত্মত্যাগ কি বৃথা গেছে। ইতিহাস সাক্ষী সাঈদের বুকের ওই রক্তবিন্দুটিই ছিল ১৫ বছরের একটি প্রতাপশালী স্বৈরাচারী শাসনের কফিনের শেষ পেরেক।
১৬ জুলাই সাঈদের মৃত্যুর ভিডিও যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে তখন সারা দেশের মানুষের রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করে। ভয়ের চাদর ছিঁড়ে রাস্তায় নেমে আসে আবালবৃদ্ধবনিতা। যে ছাত্র আন্দোলন ছিল কেবল কোটা সংস্কারের সাঈদের রক্ত ধীরে ধীরে সেটিকে রূপ দেয় সরকার পতনের এক দফা দাবিতে।
সাঈদের আত্মত্যাগের মাত্র ২০ দিনের মাথায় ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের। দেশ পায় নতুন এক স্বাধীনতা।
৫ আগস্ট স্বৈরাচার সরকারের পতনের পর ১৮ আগস্ট সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বাদী হয়ে রংপুর মহানগর আমলি আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। যেখানে ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে আসামি করা হয়। গ্রেপ্তার হয়েছে বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে পুলিশের সাবেক দুই সদস্য এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলাটি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। তবে পরিবার ও সারা দেশের মানুষের একটাই দাবি শুধু গুলি ছোঁড়া কনস্টেবল নয় নির্দেশদাতা সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্তাদেরও ফাঁসির দড়িতে ঝোলাতে হবে। বাংলার মাটিতে এই নির্মম হত্যার এমন বিচার হতে হবে যা ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর আশ্বাস দিয়েছেন শহীদদের রক্ত বিফলে যাবে না। আমিনুল ইসলাম চীফ প্রসিকিউটর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আবু সাঈদ আজ আর কোনো ব্যক্তির নাম নয়। আবু সাঈদ একটি অনুভূতির নাম। একটি অদম্য সাহসের নাম। তিনি শিখিয়ে গেছেন অধিকার আদায়ে কীভাবে বুক পেতে দিতে হয়। যতদিন এই ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে একটি নদী বয়ে যাবে যতদিন এই স্বাধীন বাংলার আকাশে লাল সবুজ পতাকা উড়বে ততদিন আবু সাঈদ বেঁচে থাকবেন প্রতিটি স্বাধীনতাকামী মানুষের হৃদয়ে। যে তরুণ বুলেটকে ভয় পায়নি জাতি তাকে ভুলবে কী করে। বিনম্র শ্রদ্ধা জুলাইয়ের অবিসংবাদিত বীর আবু সাঈদ।
আরও পড়ুন:








