বুধবার

১৫ জুলাই, ২০২৬ ৩১ আষাঢ়, ১৪৩৩

হাসিনাকে ঘিরে ভারতের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬ ১১:২০

শেয়ার

হাসিনাকে ঘিরে ভারতের কৌশলগত হিসাব-নিকাশ
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে দিল্লির অবস্থান আবার আলোচনায় এসেছে। মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে সাপ্তাহিক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ একটি আইনি বিষয় এবং তা প্রচলিত আইনি বাধ্যবাধকতা ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসারেই নিষ্পত্তি হবে। এ বিষয়ে ভারতের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি বলেও জানান তিনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানানোর পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন জয়সওয়াল।

এই প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, শেখ হাসিনা ভারতের কাছে কেবল একজন আশ্রয়প্রার্থী, নাকি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিল্লির প্রভাব বিস্তারের একটি সম্ভাব্য কৌশলগত অস্ত্র।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংকটে আশ্রয় দেওয়া এবং পরে সেই ব্যক্তিকে কূটনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করার নজির আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন নয়। তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা ১৯৫৯ সাল থেকে ভারতে আশ্রয়ে আছেন, যা ভারত-চীন সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০২১ সালে তালেবানের কাবুল দখলের পর আফগানিস্তানের বহু সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কূটনীতিকও ভারতে আশ্রয় নেন, যাদের মাধ্যমে দিল্লি আফগান রাজনীতির একটি অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ-নেটওয়ার্ক ধরে রেখেছে বলে পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য।

পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনার অবস্থান এসব নজিরের সঙ্গে পুরোপুরি তুলনীয় নয়, কারণ তিনি দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা একজন সরকারপ্রধান এবং বাংলাদেশের রাজনীতি, প্রশাসন ও নিরাপত্তা খাতে তার দীর্ঘদিনের প্রভাব ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে একাধিক ঘটনা এই আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে উঠে আসছে। ২০১৮ সালের ৩০ মে গণভবনে সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বাংলাদেশ ভারতকে যা দিয়েছে, তা দেশটি সারা জীবন মনে রাখবে এবং প্রতিদিনের বোমাবাজি-গুলি থেকে ভারতকে শান্তি ফিরিয়ে দেওয়ার কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। এ ছাড়া আদানির সঙ্গে সম্পাদিত বিদ্যুৎ চুক্তিটি অসম শর্তের অভিযোগে দেশে-বিদেশে দীর্ঘদিন সমালোচিত হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-চীন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে কিছু কূটনৈতিক বিশ্লেষকের মূল্যায়ন, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব চীনের দিকে ঝুঁকলে শেখ হাসিনা ও তার দলকে ভারতের বিকল্প প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে বলেও তারা মনে করেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহর মূল্যায়ন, শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের একটি কৌশলগত তাস, এবং বিভিন্ন সময়ে ভারতে বসে দেওয়া তার সাক্ষাৎকারগুলো এই আলোচনাকে আরও উসকে দিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপকের মতে, শেখ হাসিনাকে নিজেদের কাছে রেখে ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে কিছুটা সুবিধা আদায় এবং চাপ প্রয়োগের একটি কৌশল নিতে পারে।

তবে ভারত সরকার সবসময় বলে আসছে, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে রাষ্ট্র-রাষ্ট্র সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপ করে না। বিশ্লেষকদের একাংশের সতর্কবার্তা, শেখ হাসিনাকে দৃশ্যমান রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করলে তা ভারতের জন্যও কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে-বিশেষ করে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জনমত আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কায়।

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এরপর থেকে তাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছে। মঙ্গলবারের ব্রিফিংয়ে এই প্রত্যর্পণ প্রশ্নেও নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার কথা জানায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।



banner close
banner close