সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত এক লাখ ছয় হাজার ৩০৭ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রয়োজন হবে বলে প্রাথমিক হিসাব করেছে সরকার। এই অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে ভর্তুকি সংস্কার, করবহির্ভূত রাজস্ব বৃদ্ধি, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় সংকোচন এবং পরিচালন ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অর্থ বিভাগ ইতোমধ্যে এসব উদ্যোগের কিছু বাস্তবায়ন শুরু করেছে। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ বছরে মোট সম্ভাব্য ব্যয় দাঁড়াবে দুই লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করা হলে বাজেট ঘাটতি, সরকারি ঋণ, মূল্যস্ফীতি এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ, অর্থায়নের উৎস এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সরকারের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। সম্প্রতি অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকায় সফররত আইএমএফ প্রতিনিধিদল এসব বিষয়ে জানতে চায়।
সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় কম। এটি বাড়ানো গেলে অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে, যা নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। পাশাপাশি সরকারের অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক ব্যয় কমিয়েও প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন।
অর্থ বিভাগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সম্ভাব্য ব্যয়ের মধ্যে বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ প্রয়োজন হবে ৮৮ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে ১৭ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা।
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৭৪০ জন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাদের বেতন বাবদ বরাদ্দ রয়েছে ৪৪ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে এ খাতে অতিরিক্ত ৩৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। একইভাবে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও অন্যান্য ভাতা বাবদ বর্তমানে ৪৪ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হলেও নতুন কাঠামো কার্যকর হলে আরও ২৯ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে।
বর্তমানে প্রায় ৯ লাখ ১৬ হাজার পেনশনভোগীর জন্য ব্যয় হচ্ছে ৩৫ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা। নতুন পে স্কেল কার্যকর হলে পেনশন ও সংশ্লিষ্ট ভাতা বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ১৯ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
এ ছাড়া নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত ৪ হাজার ৯ কোটি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য ৫৭০ কোটি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য ১৩ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। সব মিলিয়ে এ তিন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে ১৭ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা।
অতিরিক্ত অর্থের সংস্থানে সরকার শুধু আয়কর ও মূল্য সংযোজন করের ওপর নির্ভর করতে চায় না। বর্তমানে মোট রাজস্ব আয়ের মাত্র ১৩ দশমিক ২ শতাংশ আসে করবহির্ভূত উৎস থেকে। এ খাতের আয় বাড়াতে বিভিন্ন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি, ভূমি ও যানবাহন কর, মাদক শুল্ক, ভাড়া ও ইজারা এবং টোল থেকে অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে এ খাত থেকে ৪৬ হাজার কোটি টাকা আদায় হলেও চলতি সময়ে তা বাড়িয়ে ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে।
একই সঙ্গে ভর্তুকি সংস্কারের মাধ্যমে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে ভর্তুকি খাতে ৯৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও চলতি অর্থবছরে তা কমিয়ে ৮৯ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশ সফর খাতে ৪২১ কোটি, সাধারণ সরবরাহ ও কাঁচামাল খাতে ৪৯৭ কোটি, বিশেষ ব্যয় খাতে ৬৩৭ কোটি, ট্রেজারি বন্ডের সুদে ২ হাজার ১২১ কোটি, জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদে ৪ হাজার কোটি এবং থোক বরাদ্দ থেকে ৬ হাজার ৪১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সরকার জ্বালানির বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, বিদ্যুতের ট্যারিফ সমন্বয় এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের দিকেও এগোচ্ছে।
অর্থ বিভাগ নতুন অর্থায়নের আরও দুটি সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করেছে। এর একটি সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া এবং অন্যটি আয়কর। বর্তমান বেতনকাঠামোয় সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা হলেও নতুন কাঠামোয় তা ২০ হাজার টাকা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সর্বনিম্ন বেতনপ্রাপ্ত চাকরিজীবীরাও আয়করের আওতায় চলে আসবেন, যা থেকে সরকারের অতিরিক্ত রাজস্ব আয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া সরকারি আবাসনে বসবাসকারী চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়ার হারও নতুন বেতনকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়তে পারে। অর্থ বিভাগের মতে, এর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে। তাদের ধারণা, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে একদিকে সরকারি ব্যয় বাড়লেও অন্যদিকে আয়কর ও বাড়িভাড়া থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
আরও পড়ুন:








