বুধবার

১৫ জুলাই, ২০২৬ ৩১ আষাঢ়, ১৪৩৩

১৫ জুলাই ছাত্রলীগের হামলায় রণক্ষেত্র ক্যাম্পাস

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৫ জুলাই, ২০২৬ ০৭:৪৯

শেয়ার

১৫ জুলাই ছাত্রলীগের হামলায় রণক্ষেত্র ক্যাম্পাস
ছবি সংগৃহীত

ফিরে দেখা জুলাই আন্দোলন; বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাণ্ডব চালায় হাসিনার বাহিনী। ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের পর দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা দলীয় সন্ত্রাসীদের।

১৪ জুলাই রাতে শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ মন্তব্যের প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছিল দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলো। সেই প্রতিবাদের রেশ কাটতে না কাটতেই ১৫ জুলাই নতুন মোড় নেয় আন্দোলন।

এদিন সকালে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক ও ফ্যাসিস্ট নেতা ওবায়দুল কাদের বলেন, আত্মস্বীকৃত রাজাকারদের জবাব ছাত্রলীগই দেবে। এই বক্তব্যের পরপরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলে পড়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা।

একই দিন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও আন্দোলনকারীদের হুমকি দেন। এরপর রাজধানী থেকে জেলা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় দফায় দফায় সংঘর্ষ।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুপুরের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাত কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হয়। বিকেল তিনটার দিকে হলপাড়া এলাকায় গেলে বিজয় একাত্তর হলের সামনে প্রথম সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

এরপর মধুর ক্যান্টিন ও আশপাশের হল থেকে আসা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। রড, হকিস্টিক ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে নিরাপরাধ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে আশ্রয় নিতে গেলে সেখানেও হামলার শিকার হয় শিক্ষার্থীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষ দ্রুত পুরো ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রলীগের হামলায় নারী শিক্ষার্থীসহ প্রায় তিনশো শিক্ষার্থী আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। এমনকি আহতদের দেখতে গিয়েও হামলার শিকার হয় অনেক শিক্ষার্থী। এসময় কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হয় ছাত্রলীগের হামলায়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আহত শিক্ষার্থীদের হাসপাতালে নেয়ার পরও সেখানে হামলা হয়েছে এবং পুলিশ কার্যকর কোনো ভূমিকা নেয়নি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলের প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় প্রাধ্যক্ষরা রাতভর হলে অবস্থান করবেন।

এই অবস্থায় সন্ধ্যার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

তবে রাতেও থামেনি সরকারদলীয়দের বর্বরতা। বিভিন্ন আবাসিক হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন তল্লাশি ও মারধর করে ছাত্রলীগ। আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে কয়েকটি হলে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে।

অন্যদিকে নতুন বাজার, কুড়িল বিশ্বরোডে সড়ক অবরোধ করেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। একই দিন ইডেন মহিলা কলেজে আন্দোলনে যোগ দিতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের বাধা দেয়া হয়। কলেজের ফটকে তালা দেয়া হলেও একদল শিক্ষার্থী তালা ভেঙে মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়।

ঢাকার বাইরে সংঘর্ষ আরও ছড়িয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, এম এম কলেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের রাতের হামলার ধারাবাহিকতায় আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি কুমিল্লা, খুলনা, দিনাজপুর, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

দিনভর ছাত্রলীগ আর দলীয় ক্যাডারদের হামলার মধ্যেই স্বৈরাচার শেখ হাসিনা বলেন, তুমি কে, আমি কে, রাজাকার, রাজাকার, স্লোগান দেয়া অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিজেদের রাজাকার বলতে তাদের লজ্জা হয় না।

একইভাবে ফ্যাসিস্ট সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এই স্লোগানকে রাষ্ট্রবিরোধী বলে হুমকি দেন। শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও আন্দোলনকারীদের ‘এ যুগের রাজাকার’ বলে মন্তব্য করেন।

এরই মাঝে রাত সাড়ে নয়টার দিকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রত্যাহার ও দুঃখ প্রকাশের দাবি জানান। পাশাপাশি ১৬ জুলাই দেশব্যাপী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল এবং সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

১৫ জুলাই ছিল জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে সহিংস দিনগুলোর একটি। আগের দিনের 'রাজাকার' মন্তব্যের জেরে সৃষ্ট উত্তেজনা এই দিন রক্তক্ষয়ী করে তোলে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে সেই হামলা ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে। আর এই হামলার প্রতিবাদে ঘোষিত ১৬ জুলাইয়ের কর্মসূচিই আন্দোলনকে নিয়ে যায় ঐতিহাসিক এক পর্বে।



banner close
banner close