জনপ্রশাসনে পদোন্নতি, পদায়ন ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে স্থবিরতা ও অসন্তোষের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা, সাবেক কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, পদোন্নতি ও পদায়নে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বৃদ্ধি এবং সাম্প্রতিক পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিতর্ক প্রশাসনের কার্যক্রম ও কর্মকর্তাদের মনোবলে প্রভাব ফেলছে। তবে অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণে বিশেষ ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তারা উল্লেখ করেছেন।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষ নয়টি পদে চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে নয়জন সচিবকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও মাঠ প্রশাসনে পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারির পর তা প্রত্যাহার করে নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রশাসন ক্যাডারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সাবেক ইকোনমিক ক্যাডার নিয়ে অসন্তোষ এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে জুলাইবিপ্লবে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়ে পরে জনপ্রশাসনে ফিরিয়ে আনার ঘটনাও প্রশাসনে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১৭৯ জন উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। পদোন্নতির তালিকায় অবসরপ্রাপ্ত, শাস্তিপ্রাপ্ত ও বিতর্কিত কয়েকজন কর্মকর্তার নাম থাকার অভিযোগ ওঠায় শুধু পদোন্নতি নয়, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) তথ্য যাচাই প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, ভূমি, নির্বাচন কমিশন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন এবং স্বরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে একাধিক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক সিনিয়র সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যাখ্যা হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে প্রশাসনকে গতিশীল করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা প্রতিবেদনে বলেছেন, দীর্ঘদিন প্রশাসনের বাইরে থাকা কর্মকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির প্রত্যাশা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, বিভিন্ন দপ্তরে দীর্ঘদিন চলতি দায়িত্ব বজায় থাকায় অনেক ক্ষেত্রে নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও বিলম্ব হচ্ছে।
প্রতিবেদনে প্রশাসনের কাঠামো অনুযায়ী এসএসবির ভূমিকারও উল্লেখ করা হয়েছে। বোর্ডটির সভাপতি মন্ত্রিপরিষদ সচিব। সদস্য হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল, স্বরাষ্ট্র সচিব, অর্থ সচিব, জনপ্রশাসন সচিব এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সচিব দায়িত্ব পালন করেন। বোর্ডের সিদ্ধান্তের আগে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কর্মপত্র জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা প্রস্তুত করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা অবসরসংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে কর্মপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্ব। এসব তথ্য উপস্থাপিত না হলে এসএসবির সদস্যদের পক্ষে বাস্তব পরিস্থিতি জানা কঠিন হতে পারে। আর তথ্য উপস্থাপনের পরও যদি যথাযথ মূল্যায়ন ছাড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তবে তার দায় সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বোর্ডের ওপর বর্তাতে পারে বলে তারা মত দিয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, প্রশাসনে পদোন্নতি মেধা, যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তিনি বলেন, অবসরপ্রাপ্ত বা শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পদোন্নতির অভিযোগ ওঠা তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিশেষ ক্ষেত্রে এ ধরনের নিয়োগ হতে পারে, তবে সরকারকে যোগ্য নতুন কর্মকর্তাদেরও সুযোগ করে দিতে হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের যোগ্যতা রয়েছে বলেই সরকার তাদের দায়িত্ব দিয়েছে। তবে সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে যোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। ১৭৯ জনের পদোন্নতি নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এবং এ ধরনের ভুল কীভাবে হয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা উচিত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তাঁর একান্ত সচিব মো. হাফিজুর রহমান জানান, সিনিয়র সচিব সাংবাদিকদের সাক্ষাৎ দেন না এবং মোবাইল ফোনেও কথা বলেন না। পরে এ বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ ও বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ব্যক্তি নয়, বরং প্রশাসনিক কাঠামোর কার্যকারিতা। তাদের মতে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি, সময়মতো পদায়ন, তথ্য যাচাইয়ের নির্ভুলতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন:








