১৪ জুলাই জুলাই আন্দোলনের চতুর্দশ দিন। আন্দোলনের ইতিহাসে যে দিনটি পরবর্তী প্রতিবাদের ভিত্তি তৈরি করে। দিনের শুরুতে পূর্বঘোষণা অনুযায়ী কোটা সংস্কারের এক দফা দাবিতে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিতে গণপদযাত্রা করে আন্দোলনকারীরা। সকাল ১১টা থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকে। দুপুর ১২টার দিকে সেখান থেকে পদযাত্রা শুরু হয়। শাহবাগ, মৎস্য ভবন হয়ে হাইকোর্টের সামনে পৌঁছালে প্রথম দফায় পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়ে শিক্ষার্থীরা। জাতীয় প্রেসক্লাব হয়ে বঙ্গভবনের দিকে এগোতে গেলে আরও কয়েক দফা ব্যারিকেড দেয় পুলিশ। তবে আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড অতিক্রম করে গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেখানে আবারও পুলিশের বাধার মুখে কিছুক্ষণ অবস্থান নেয় তারা। একপর্যায়ে দুপুর ১টা ৪০ মিনিটের দিকে শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড ভেঙে বঙ্গভবনের দিকে অগ্রসর হয়। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের কাছে স্মারকলিপি জমা দেয়।
স্মারকলিপিতে সরকারি চাকরিতে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ কোটা রেখে বৈষম্যমুক্ত কোটা সংস্কার, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার এবং দ্রুত সংসদের অধিবেশন ডেকে আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। স্মারকলিপি জমা দিয়ে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংসদে বিষয়টি নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাও প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা শহরেও পদযাত্রা ও স্মারকলিপি কর্মসূচি পালন করে শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ কৃষি, জাহাঙ্গীরনগর, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয় ও সংহতি সমাবেশ করে।
এদিন সরকারি চাকরিতে কোটা বহাল রেখে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ও প্রকাশ করা হয়। একইসঙ্গে স্বৈরাচারী সরকারের মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে আন্দোলন নিয়ে একের পর হুমকি আসে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, শিক্ষার্থীরা না বুঝেই আন্দোলন করছে, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত চলবে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, কোটা সংস্কারের বিষয়টি মন্ত্রিসভায় আলোচনা হবে। আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও অন্যতম ফ্যাসিবাদী নেতা ওবায়দুল কাদের দাবি করেন, বিএনপি আন্দোলনকে সরকারবিরোধী কর্মসূচিতে রূপ দিতে চাইছে।
বিকেলে গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে কোটা আন্দোলন নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের কটাক্ষ করে বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা চাকরি পাবে? এই একটি মন্তব্য মুহূর্তেই আন্দোলনে নতুন মোড় এনে দেয়।
শেখ হাসিনার ওই কটাক্ষের পর রাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে মিছিল বের হয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হয় হাজারো শিক্ষার্থী। ক্যাম্পাসজুড়ে ধ্বনিত হতে থাকে তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার, চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার, মেধা না কোটা মেধা সহ নানা স্লোগান।
শিক্ষার্থীরা হল থেকে বের হতে শুরু করলে কয়েকটি আবাসিক হলের ফটকে অবস্থান নেয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। অনেক জায়গায় মিছিল আটকে দেওয়ার চেষ্টা হলেও শেষ পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের থামানো যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পাশাপাশি রোকেয়া হল, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল এবং শামসুন্নাহার হলের শিক্ষার্থীরাও এই বিক্ষোভে যোগ দেন। রাত দেড়টার পর টিএসসির কর্মসূচি শেষ হলে শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে যায়। এর কিছুক্ষণ পর বুয়েটের কয়েকশো শিক্ষার্থীও মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সংহতি জানিয়ে নিজ ক্যাম্পাসে ফিরে যায়।
৫ আগস্ট পালালেও হাসিনার কবর রচিত হয় ১৪ জুলাই। ফিরে দেখা জুলাইয়ে এই উত্তাল রাতের আগে দিনের শুরুটা ছিল আরেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে। ১৪ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহে আন্দোলন এক নতুন মোড়ে পৌঁছে যায়। দিনের বেলায় রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিয়ে সাংবিধানিক সমাধানের আহ্বান জানানো হলেও সন্ধ্যায় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার রাজাকারের নাতিপুতি মন্তব্য মুহূর্তেই আন্দোলনের চরিত্র বদলে দেয়। রাতভর ক্যাম্পাসজুড়ে প্রতিবাদের যে ঢেউ ওঠে সেটিই পরবর্তী কয়েক দিনের প্রতিবাদের ভিত্তি তৈরি করে।
আরও পড়ুন:








