মঙ্গলবার

১৪ জুলাই, ২০২৬ ২৯ আষাঢ়, ১৪৩৩

গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: বাংলাদেশ কী পেলো?

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩ জুলাই, ২০২৬ ২২:৩৯

শেয়ার

গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: বাংলাদেশ কী পেলো?
ছবি সংগৃহীত

রক্তঝরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি। ২০২৪ সালের সেই উত্তাল দিনগুলো কেবল একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনই ঘটায়নি, বরং বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে দেশের মানুষ বুনেছিল নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন। বুক পেতেছি গুলি কর বুকের ভিতর ঝড়। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন কিংবা ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার। ইতিহাসের প্রতিটি সংগ্রামী বাঁক যেন এসে মিলেছিল ২০২৪-এর ৩৬ জুলাইয়ের এক মোহনায়।

১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থান। ১৯৯০ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। ২০১৮ কোটা সংস্কার আন্দোলন। আজ, সেই মুক্তির দুই বছর পর, মানুষের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির সমীকরণ আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে? আপস। অন্ধকার ফ্রেমে লাল জ্বলজ্বলে প্রশ্নবোধক চিহ্ন।

২৪ পরবর্তী দেশের সার্বিক আইন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলা এডিশনের একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন দেশের দুজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

একজন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এএসএম শাহরিয়ার কবির। শাহরিয়ার কবির, আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট আরেকজন অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক। হাসিনুর রহমান, লে. কর্নেল (অব.)।

ফিরে দেখা যাক সেই অগ্নিগর্ভ অতীত। ১৫ জুলাইয়ের শান্তিপূর্ণ কোটা সংস্কার আন্দোলন মুহূর্তেই রূপ নিয়েছিল দুর্বার গণজাগরণে।

কোটা না মেধা? কিন্তু তৎকালীন স্বৈরাচার হাসিনা সরকার অহংকার আর দাম্ভিকতার বশে বেছে নেয় কঠোর দমননীতি, পুলিশি নির্যাতন, নির্বিচার গ্রেপ্তার, লাঠিশোঁটা ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ভয় না পেয়ে সাধারণ মানুষ শহরের অলিগলি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, গ্রামীণ হাটবাজার থেকে প্রশাসনিক কেন্দ্র, প্রতিটি প্রান্ত রূপ নেয় সংগ্রামের মঞ্চে।

স্বৈরাচার যেখানে লড়াই হবে সেখানে। আর আন্দোলন চলাকালে ইন্টারনেট বন্ধ করে তথ্যপ্রবাহ স্তব্ধ করার চেষ্টা, নির্বিচার গ্রেপ্তার আর আগ্নেয়াস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারে রাজপথ ভিজেছিল ছাত্রদের রক্তে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের মতে, সে সময় নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছিল প্রায় চৌদ্দশ।

রংপুরে আবু সাঈদের মতো হাজারো তরুণের আত্মত্যাগ এবং স্বজন হারানো পরিবারের কান্না বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল প্রবলভাবে।

অবশেষে ৫ আগস্ট, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে পতন ঘটে ১৫ বছরের একনায়কতন্ত্র কায়েম করা শেখ হাসিনার।

চরম এক রাজনৈতিক শূন্যতার মাঝে দেশের হাল ধরেছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের হাত ধরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, রাজবন্দীদের মুক্তি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরে আসার মতো বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখেছে রাষ্ট্র।

তবে, শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে ধীরগতি, জুলাই অভ্যুত্থানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কিছুটা হতাশারও জন্ম দেয়।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে অবশেষে ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিত হয় বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দীর্ঘ ২৪ বছর পর মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বিএনপি। সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান।

দায়িত্ব নিয়েই দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে কঠোর অবস্থান জানান দিয়ে জনমনে আস্থা তৈরি করেছে নতুন এই সরকার।

সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকানো থেকে শুরু করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপন, প্রতিটি পদক্ষেপই দেশের অভ্যন্তরে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারে নেয়া হয়েছে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

জুলাই সনদ, আস্থা পুনর্গঠন আর ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা নিয়ে বাংলা এডিশনের কাছে নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল হাসিনুর রহমান। তিনি মনে করেন, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো না গেলেও অর্জন অনেক। তাঁর মতে, বিগত ৫৪ বছরের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময় বাদে বাকিটা সময় প্রতিবেশী ভারতের যে একচেটিয়া শোষণ, ৫ আগস্টের আন্দোলন ছিল তারই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। এই অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল আরো বলেন, একটি সুনির্দিষ্ট জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা গেলে তা আগামী প্রজন্মের জন্য আরও ভালো হতো বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

গুম ও নির্যাতনের বিচার নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আরো জানান, বিগত আমলের প্রায় ১৮শ মামলা তুলে নেয়া হলেও আয়নাঘরের প্রকৃত নেপথ্য কারিগরদের বিচার এখনো অধরা।

শুধু কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি অনুযায়ী দায়িত্বরতদের বিচার করলেই হবে না, বরং বাস্তবে যারা গুম ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছিল, সেই সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের এখনো চিহ্নিত না করাটাকে একটি বড় শূন্যতা হিসেবে দেখছেন তিনি।

আন্দোলনের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও কৃতিত্ব বণ্টনের বিষয়েও নিজের স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন হাসিনুর রহমান। তিনি মনে করেন, পুরো বিপ্লবের কৃতিত্বকে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক করে ফেলা হয়েছে, যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবদানের প্রতি এক ধরনের অবিচার।

সেই সাথে, রংপুরের শহীদ আবু সাঈদের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর আগেই তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরশ্রেষ্ঠ ঘোষণা না করাটাকে তিনি বর্তমান সরকারের একটি বড় ব্যর্থতা বলে উল্লেখ করেন। দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধির সমালোচনা করে তিনি জুলাইয়ে আহতদের চিকিৎসার জন্য সিএমএইচসহ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে বড় বাজেট ও স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবিও জানান।

৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দেশের বুকে এক নতুন ভোরের সূচনা করেছে। দীর্ঘদিনের ভয়ের সংস্কৃতি ভেঙে আজ মানুষ কথা বলছে স্বাধীনভাবে। গণমাধ্যম ফিরে পেয়েছে তার স্বাভাবিক গতি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ হওয়াকে এই সময়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান। তার মতে, গুম সংস্কৃতির অবসান এবং বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়াই প্রমাণ করে, দেশ ইতিবাচক পথে এগোচ্ছে।

হাসিনুর রহমান মনে করেন, সরকার প্রধান তারেক রহমান জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করছে। সেই সাথে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রত্যাশাও করেন তিনি।

অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের চরিত্র নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যাখ্যা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এএসএম শাহরিয়ার কবির। তাঁর মতে, এই আন্দোলনকে শুধু স্বৈরাচার পতন বলাটা একটি সরলীকরণ এবং এটি আসলে একটি পূর্ণাঙ্গ জনযুদ্ধ।

তিনি যুক্তি দেন, ১৯৭১ সালের জনযুদ্ধের মতোই ২০২৪ সালের এই ৩৬ দিনের সংগ্রামও দেশের ইতিহাসে আরেকটি রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধ।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতার প্রকৃতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই আইনজীবী, যুক্তি দিয়েছেন ৭ নভেম্বরকে প্রকৃত মুক্তির দিন হিসেবে।

তবে, ২৪ এর শহীদদের জন্য, বর্তমানে সমালোচনা করার অধিকার ও বাকস্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরে আসাকে, গত দুই বছরের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক অর্জন হিসেবে দেখছেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির। এসময় শাহরিয়ার কবির, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক তৈরির জন্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।

আর যারা এই গণআকাঙ্ক্ষার সাথে বেইমানি করবে, ভবিষ্যতে এ দেশে তাদের কোনো ঠাঁই হবে না বলেই মনে করেন, এই আইনজীবী।

জুলাই অভ্যুত্থান কেবল একটি জীর্ণ ব্যবস্থার পতন ছিল না, এটি ছিল একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ার সূচনা। বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ছাত্র-জনতা যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন প্রতিটি নাগরিকের অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ দৃষ্টি। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, স্বৈরাচার বারবার ফিরে আসার চেষ্টা করে, কিন্তু জাগ্রত জনতার সম্মিলিত প্রতিরোধই পারে সেই দানবকে চিরতরে রুখে দিতে। সোমবার (১৩ জুলাই) এই দুই বছর পূর্তিতে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো জুলাই সনদ ও হত্যার বিচারের অপেক্ষায় ঝুলে আছে।



banner close
banner close