গত এক সপ্তাহে দেশের নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনীতির পরিমণ্ডলে ঘটেছে এমন কিছু ঘটনা, যা দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক সমীকরণকে আমূল বদলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আর এতেই দিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।
গত ৯ জুলাই সচিবালয়ে বিএসআরএফ সংলাপে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ঘোষণা দেন, বগুড়া বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে এবং সেখানে বিমান বাহিনীর নতুন শক্তিশালী ঘাঁটি স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়।
ঠিক তার একদিন আগেই, ৮ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে বগুড়ায় তুরস্কের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সামরিক ড্রোন কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে।
নিঃসন্দেহে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো উন্নয়ন নয়। একটি দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য এই দুটি ঘোষণা একই সুতোয় গাঁথা। বাংলাদেশ যেন এখন কেবল অস্ত্র কিনছে না, বরং নিজের মাটিতেই মেইড ইন বাংলাদেশ সামরিক সরঞ্জাম তৈরির এক দীর্ঘমেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছে। যে তুরস্কের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের সামরিক সখ্যতা, যে দেশটির অবস্থানের কারণে কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত বরাবরই অস্বস্তিতে থাকে, সেই তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের এই কৌশলগত মিত্রতা এখন বিশ্ব রাজনীতির নজর কেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই নতুন ঘাঁটি এবং ড্রোন কারখানা আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের সামরিক মানচিত্রকে বদলে দিতে পারে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন ড্রোন কারখানা? ড্রোন বা আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল আধুনিক যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এতদিন বাংলাদেশ ড্রোনের জন্য বিদেশনির্ভর ছিল। কেনা থেকে শুরু করে যন্ত্রাংশের জন্য বাইরের দেশের মুখাপেক্ষী হওয়া, এতে যেমন খরচ বেশি, তেমনই কৌশলগত ঝুঁকিও রয়েছে। কিন্তু, নিজেদের কারখানায় ড্রোন তৈরি হলে পুরো সাপ্লাই চেইন চলে আসবে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে।
তুরস্কের বাইরাক্তার টিবি-২ শুধু নজরদারি করার ড্রোন নয়, এটি একটি বহুমুখী মরণাস্ত্র। এটি লেজার গাইডেড স্মার্ট বোমা বহন করতে সক্ষম। ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ ট্যাঙ্ক ধ্বংস বা নাগোরনো-কারাবাখ যুদ্ধে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করার ঘটনাগুলো বিশ্ব দেখেছে। এর মূল শক্তি স্থায়িত্ব এবং নিখুঁত নিশানা। যখন বগুড়ার মাটিতে এই ড্রোন উৎপাদিত হবে, তখন বাংলাদেশের হাতে থাকবে এমন এক আকাশপ্রহরী, যা দীর্ঘসময় আকাশে ভেসে থেকে শত্রুর যেকোনো অবস্থান শনাক্ত ও নিমেষেই ধ্বংস করতে পারবে। এটি শুধু প্রতিরক্ষা নয়, বরং শত্রুকে সরাসরি আঘাত করার সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
জাতীয় সংসদের অধিবেশনের এক বক্তব্যে, আগামী ১০ বছরে ৮৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তারেক রহমান। এই বরাদ্দের লক্ষ্য কেবল সাধারণ উন্নয়ন নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধবিমান, আধুনিক ফ্রিগেট ও করভেট শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ, এআই চালিত ড্রোন এবং নৌবাহিনীর জন্য বিশেষ ডুবোযান।
বিশেষ করে পানির নিচে চলা সেই বিশেষ যান, যার নাম অনেক সময় কৌশলের খাতিরে নেওয়া হয় না, তা মূলত বাংলাদেশের জলসীমায় সাবমেরিন বিরোধী অপারেশনের জন্য গেম চেঞ্জার হতে পারে। নৌবাহিনী এখন কেবল সমুদ্র রক্ষা নয়, বরং সমুদ্রসীমার অতল গহ্বর থেকে নজরদারি চালাতে সক্ষম হচ্ছে। আধুনিক ফ্রিগেটগুলো এমন সেন্সর এবং মিসাইল সিস্টেমে সজ্জিত, যা শত্রুর রাডার এড়িয়ে আক্রমণ চালাতে সক্ষম। অর্থাৎ, আকাশ, স্থল এবং সমুদ্র, এই তিন দিক থেকেই বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা দুর্গে পরিণত করার কাজ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্পষ্ট ঘোষণা, দেশেই সামরিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হবে, যাতে বৈদেশিক নির্ভরতা কমে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশ সামরিক প্রযুক্তিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব কারণেই দিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। মূলত ভূ-রাজনীতির সেই স্পর্শকাতর প্রশ্নে চিকেন নেক বা শিলিগুড়ি করিডোর। বগুড়া থেকে এই করিডোর খুব একটা দূরে নয়। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বগুড়ায় নতুন বিমান ঘাঁটি এবং ড্রোনের উপস্থিতি ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগ বাড়াবে। কারণ, নজরদারি ড্রোনগুলো খুব সহজেই সীমান্ত এলাকায় তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তুরস্ক। ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার সময়ে তুরস্ক সবসময় পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে এসেছে। ভারত বারবার একে তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এখন সেই তুরস্ক যখন বাংলাদেশের সামরিক শিল্পে এমন গভীর অংশীদারিত্ব গড়ছে, তখন নয়াদিল্লি একে কেবল বাণিজ্য হিসেবে দেখছে না। তারা একে দেখছে একটি নতুন প্যাটার্ন বা মেরুকরণ হিসেবে।
অনেকেই বলছে, এটি চীন-ভারত উত্তেজনার মতো একটি চ্যালেঞ্জ। তবে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছে, বাংলাদেশ সবসময়ই তার নিজস্ব নিরাপত্তার স্বার্থে আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহের পথ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশ সরাসরি কারো প্রতি শত্রুতা নয়, বরং ডিটারেন্স বা প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
বাংলাদেশ এখন আর কেবল দর্শক নয়, বরং খেলোয়াড়। এই ৮৬ হাজার কোটি টাকার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বদলে যাবে। নিজস্ব অস্ত্র তৈরির এই যাত্রা বাংলাদেশকে সামরিক দিক থেকে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয় আগামী এক দশকে এই মহাপরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবতার মুখ দেখে।
আরও পড়ুন:








