পুরনো এসি কেনাবেচার কাজ করতে শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস ওরফে তাওহীদ। রাজধানীর উত্তরায় এই ব্যবসার পাশাপাশি ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবেও কাজ করতেন। কিন্তু একপর্যায়ে হরিদাস নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই পরিচয় ব্যবহার করে শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকার প্রতারণা করেছেন। তার নামে চার কোটি টাকাসহ আরও বেশ কিছু টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার দুপুরে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব তথ্য জানান।
রাজধানীর কাওরান বাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে জানানো হয়, সোমবার রাজধানীর বনানী এলাকায় এনএসআই ও র্যাব-৩ যৌথ অভিযান চালিয়ে শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস ওরফে তাওহীদ ও ইমরান মেহেদী হাসানকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে চারটি মোবাইল ফোন, জালিয়াতিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ডকুমেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিট করা ভুয়া ছবি উদ্ধার করা হয়।
কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার একটি ছবি এডিট করে তার ওয়ালপেপারে সংযুক্ত করে রাখেন। তখন থেকেই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ভাঙিয়ে কীভাবে অর্থ উপার্জন করা যায় তার ফন্দিফিকির করতে থাকেন। প্রাথমিকভাবে তিনি সফলতা অর্জন করতে পারেননি। ২০১৯ সালে ধর্মান্তরিত হন। পরে শ্বশুরবাড়ির পরিচয় ব্যবহার করে ময়মনসিংহ এলাকায় তার প্রতারণার ভিত মজবুত করতে সক্ষম হন। এ পর্যন্ত প্রতারণার মাধ্যমে তিনি প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট রিসোর্টসহ ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এলাকায় নামে বেনামে অনেক জমি কিনতে সক্ষম হয়।
খন্দকার আল মঈন বলেন, এক শ্রেণির প্রতারক সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে। তাদের প্রটোকল অফিসার এবং বিভিন্ন মন্ত্রীর এপিএস পদবি ব্যবহার করে তারা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে।
মঈন বলেন, প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হলে এলাকার উন্নতি হবে বলে প্রলুব্ধ করা হতো। তার প্রতারণায় প্রলুব্ধ হয়ে অনেকেই চাকরি, বদলি, টেন্ডারসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদবির করার জন্য তার সহায়তা চায়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি চাকরি প্রত্যাশী, পছন্দমতো জায়গায় বদলি প্রত্যাশী সরকারি চাকরিজীবী, বিভিন্ন ক্রয়-বিক্রয় ও উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডারে অংশ নিতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করতে থাকেন।
গ্রেপ্তারকৃত ইমরান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত তার বিভিন্ন সহযোগীসহ অন্যান্য ক্লায়েন্ট সংগ্রহ করে হরিদাস ওরফে তাওহীদের কাছে নিয়ে আসতেন। এসময় তাওহীদ এসব ব্যক্তিদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিভিন্ন পদে চাকরি, পদোন্নতি এবং বদলির বিষয়ে আশ্বস্ত করে তাদের কাছ থেকে অর্থ আত্মসাৎ করতেন। র্যাব জানায়, তাওহীদ অত্যন্ত বাকপটু এবং একবার তার সঙ্গে কেউ পরিচিত হলে তার প্রতারণার খপ্পর থেকে বের হতে পারে না।
প্রতারণার টাকায় রিসোর্ট
হরিদাস ওরফে তাওহীদ র্যাবকে জানান, তিনি প্রতারণার মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ২০১৯ সালে ফুলবাড়িয়া এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমি কিনে প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক নামে রিসোর্টের কাজ শুরু করেন। কাজ শুরু হলে তার প্রলোভনে আরও অনেকেই টাকা লেনদেনের রসিদ ছাড়া তাকে লাখ লাখ টাকা দেয়। ২০২০ সাল প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে রিসোর্টের কাজ শেষ হয়। পরে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটকদের জন্য এই রিসোর্ট উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
রিসোর্টে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা, সুইমিংপুলে গোসল ১০০ টাকা এবং রিসোর্টের ভেতরে ঘোরাঘুরির জন্য ৫০ টাকা করে টিকেট কিনতে হয় দর্শনার্থীদের। দলে দলে পর্যটক তার রিসোর্টে ভিড় করতে থাকে। অনেকে বিয়ে, জন্মদিনসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য তার রিসোর্ট ভাড়া নিতে থাকে। তখন তিনি বিভিন্ন বিত্তশালী ব্যক্তিদের তার রিসোর্টে আমন্ত্রণ জানান এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিট করা ছবি দেখিয়ে তার প্রজেক্টসহ অন্যান্য প্রজেক্টে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেন।
তাওহীদের একাধিক ব্যাংকে নামে-বেনামে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট রয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে এই অ্যাকাউন্টগুলোতে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি কখনও নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা বা তার পরিবারের সদস্যদের প্রটোকল অফিসার, বৈমানিক কর্মকর্তাসহ ভুয়া পরিচয় দিয়ে নানাবিধ প্রতারণা করে আসছিলেন। বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে টেন্ডারের বিষয়ে তদবির করার জন্য ভুয়া পরিচয় দিয়ে ফোনালাপ করে টেন্ডারে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেন। যদিও সে কাউকে কাজ পাইয়ে দিতে সক্ষম হননি।
গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে র্যাব দাবি করেছে, তাওহীদ সোনা চোরাচালান ও সোনার বারের অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।
সহযোগী
হরিদাস ওরফে তাওহীদের সহযোগী ইমরান মেহেদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ক্যাশিয়ার। অর্থ জালিয়াতির বিভিন্ন অভিযোগ ওঠায় শাস্তিস্বরূপ ২০২২ সালের প্রথম দিকে বিভাগীয় শহর থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি করা হয় তাকে। এছাড়াও তিনি অসুস্থতার মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে আগস্ট ২০২২ থেকে কর্মস্থলে গড়হাজির আছেন। পরবর্তীতে তিনি তাওহীদের মাধ্যমে নিজের বদলি বাতিল করার চেষ্টা করেন।
এরপর তারা দুজন মিলে ওই কপির ওপরে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের একজন সদস্যের নাম লিখে ভুয়া সিল দিয়ে একটি ভুয়া ডিও লেটার তৈরি করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মোবাইলে অ্যাপসের মাধ্যমে এই লেটার পাঠিয়ে দ্রুত বদলির আদেশ বাতিল করে আগের পদে বহালের জন্য সুপারিশ করেন। ওই ডিও লেটারটি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় কর্তৃপক্ষ এনএসআইয়ের কাছে অভিযোগ করেন।
লেখাপড়া
হরিদাস ওরফে তাওহীদ ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় অবৈধ উপায়ে পার্শ্ববর্তী দেশে যান। সেখানে তার এক আত্মীয়ের বাসায় ওঠেন এবং সেখানকার পঞ্চায়েত প্রধানের কাছ থেকে কৌশলে একটি এতিম সার্টিফিকেট নেন। পরে সেখানকার একটি স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে এবং ইলেকট্রনিক বিষয়ে দুই বছরের বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন।
পরবর্তীতে ২০১০ সালে বাংলাদেশে এসে রাজধানীর উত্তরায় পুরাতন এসি কিনে মেরামত করে বিক্রির কাজ শুরু করেন। এসময় উত্তরার একটি হাসপাতালের এসি মেরামত বা এসি সাপ্লাইয়ের বিষয়ে তার সঙ্গে চুক্তি হয়। এরপর ২০১৮ সালে একজন সবজি বিক্রেতার সঙ্গে সাবলেট বাসা ভাড়া নেন। ওই বাসায় থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালে ধর্মান্তরিত হয়ে সবজি বিক্রেতার মেয়েকে বিয়ে করেন। শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস নাম পরিবর্তন করে তাওহীদ ইসলাম ধারণ করেন।
আরও পড়ুন:








