কওমি মাদ্রাসা স্থাপনের জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং হাফেজিয়া মাদ্রাসার জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনের সরকারি উদ্যোগ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদ। সংগঠনটির দাবি, এ ধরনের উদ্যোগ বিদ্যমান আইন, কওমি শিক্ষাব্যবস্থার স্বকীয়তা এবং দীর্ঘদিনের স্বতন্ত্র পরিচালনা কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শনিবার অনুষ্ঠিত সংগঠনের এক জরুরি সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতি দেয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী (পীর সাহেব দেওনা)।
বিবৃতিতে বলা হয়, জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬-এর সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের উপসচিব (মাদ্রাসা-২) মো. রাহাত খান (৭ জুলাই, ২০২৬) স্বাক্ষরিত এক পত্রে কওমি মাদ্রাসা স্থাপনের নীতিমালা প্রণয়ন এবং দেশের সব হাফেজিয়া মাদ্রাসার জন্য একটি কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠনের বিষয়ে আলোচনা করতে আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান, কো-চেয়ারম্যান এবং এর অধীন ছয়টি বোর্ডের সভাপতি বা প্রতিনিধিদের ৯ জুলাই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে সংগঠনের দাবি, আল-হাইআতুল উলয়া ও সংশ্লিষ্ট বোর্ডগুলোর প্রতিনিধিরা ওই সভায় অংশগ্রহণে অসম্মতি জানিয়েছেন।
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষা-দর্শনের আলোকে পরিচালিত কওমি মাদ্রাসাগুলো বহু দশক ধরে সরকারি অনুদান ছাড়াই মক্তব থেকে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। বর্তমানে বিভিন্ন স্বীকৃত বোর্ডের মাধ্যমে পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, পরীক্ষা গ্রহণ, সনদ প্রদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পরিদর্শন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। হেফজ বিভাগও এসব বোর্ডের অধীন একটি মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে তারা উল্লেখ করেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা-সংক্রান্ত আইন কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যকে আইনি সুরক্ষা দিয়েছে। একই আইনের আওতায় আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। ফলে বিদ্যমান কাঠামো বহাল থাকা অবস্থায় পৃথক হাফেজিয়া বোর্ড গঠনের যৌক্তিকতা নেই বলে সংগঠনটির মত।
সংগঠনটি আরও জানায়, প্রাইভেট কিছু হেফজখানা সর্বস্ব প্রতিষ্ঠান আছে, এর মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের নৈতিক অবক্ষয়ের মহামারির সময়ে কিছু দ্বীনি খেদমত চালু আছে। এ শ্রেণির প্রাইভেট মাদ্রাসাসমূহ স্বীকৃত যেকোন বোর্ডের অনুমোদন জরুরি, ‘কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদ’-এর সুপারিশ বেফাকসহ অন্যান্য বোর্ড কর্তৃপক্ষ সে সব হেফজখানাকে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে একীভূত করার জোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।
বিবৃতিতে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, কওমি মাদ্রাসা স্থাপনের নীতিমালা ও হাফেজিয়া মাদ্রাসার জন্য পৃথক কেন্দ্রীয় বোর্ড গঠন করা প্রচলিত আইনের সাথে সাংঘর্ষিক, এধরণের উদ্যোগে দেশের সব কওমি উলামায়ে কেরামকে হতাশ ও মর্মাহত করেছে। কুরআন শিক্ষায় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা পাশ্চাত্যের কুরআন শূন্য করার একটি পুরানা কৌশল। বিশেষ করে ৮ অক্টোবর, ২০১৮ সালের ৪৮ নং কওমি মাদ্রাসা আইনটি সংশোধনের অজুহাতে বাতিল করার একটি সু-গভীর চক্রান্ত। বাংলাদেশে একটি ইসলাম বিদ্বেষী মহল এভাবে কওমি মাদ্রাসা স্থাপন ও কুরআন হিফজ করাকে বন্ধ করার অপকৌশল হিসাবে কওমি মাদ্রাসা স্থাপনের নতুন নীতিমালার মাধ্যমে দ্বীনি শিক্ষার প্রচার-প্রসার সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন করে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেবে, যা দ্বীনি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা বাধাগ্রস্ত হবে মর্মে আশঙ্কা করা হচ্ছে এবং কুরআন হেফজ করার যে চিরাচরিত নীতির পরিপন্থি, কুরআন হেফজ করার সাথে অন্যান্য বিষয় শিখানো শর্ত আরোপ করলে হেফজ করা দারুণভাবে বিঘ্নিত হবে। এমতাবস্থায় সরকার হাফেজিয়া মাদ্রাসার জন্য পৃথক বোর্ড করে হেফজ শিক্ষার্থীদের একই সাথে যদি বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি অন্যান্য বিষয় পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে দেয় তাহলে হেফজ শিক্ষার ধারাবাহিকতা বন্ধ হয়ে যাবে। পবিত্র কুরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের এধরণের অযাচিত হস্তক্ষেপে জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়ে অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।
সবশেষে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি কওমি মাদ্রাসার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, বিদ্যমান আইন এবং প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা কাঠামোর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে পৃথক হাফেজিয়া বোর্ড গঠন ও নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদের সভায় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির সহ-সভাপতি মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ূবী, সহ-সভাপতি মাওলানা আলি আজম, মহাসচিব মাওলানা মুস্তাকিম বিল্লাহ হামিদী, যুগ্ম মহাসচিব মুফতি দ্বীন মুহাম্মদ আশরাফ, যুগ্ম মহাসচিব মেরাজুল হক মাজহারীসহ সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা।
আরও পড়ুন:








