রবিবার

১২ জুলাই, ২০২৬ ২৮ আষাঢ়, ১৪৩৩

জনসংখ্যার রিপোর্ট লেখা শিখতে বিদেশ যেতে চান ১৪০ কর্মকর্তা, ব্যয় প্রায় ৩ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২৬ ১৩:০৫

শেয়ার

জনসংখ্যার রিপোর্ট লেখা শিখতে বিদেশ যেতে চান ১৪০ কর্মকর্তা, ব্যয় প্রায় ৩ কোটি টাকা
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

সরকারের কৃচ্ছ্রসাধনের নীতির মধ্যেই জনসংখ্যা ও পুষ্টি বিষয়ে রিপোর্ট তৈরি শেখার প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে ১৪০ কর্মকর্তাকে পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্টরা। তাদের আপত্তির মুখে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের প্রস্তাবটি সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, জনসংখ্যা ও পুষ্টির রিপোর্ট তৈরি শেখার জন্য ১৩৫ কর্মকর্তাকে বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানো এবং আরও পাঁচজনকে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জনসংখ্যা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে বাস্তবায়ন করবে জাতীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)।

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১১৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নে নিপোর্টের সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবে বিদেশ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ২০০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) কেনা এবং গবেষণা খাতে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবও রয়েছে। গত ২২ জুন অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। পরে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বর্তমানে সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতির আওতায় সরকারি অর্থায়নে বিদেশে প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ ও সেমিনারে অংশগ্রহণ, প্রকল্পের আওতায় নতুন গাড়ি কেনা এবং ভবন নির্মাণে বিধিনিষেধ রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ে ভ্যালু ফর মানি নিশ্চিত করার নির্দেশনাও কার্যকর রয়েছে।

পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশীদ বলেন, এ ধরনের প্রস্তাব যারা দেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে কঠোর শাস্তির সুপারিশ করা প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর ও অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব কমে আসবে।

পিইসি সভায় পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) নাসরীন জাহান বিদেশ সফরের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি জানান, নিপোর্টের কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিদেশে প্রশিক্ষণ ও ডিগ্রির প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

নিপোর্টের কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ নারায়ণ কুমার রায় বলেন, প্রায় ১৩০ জন নতুন কর্মকর্তা যোগ দিয়েছেন। এটি একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট হওয়ায় কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। তিনি জানান, প্রকল্পটি যখন তৈরি হয়েছিল তখন সরকারি বিধিনিষেধ ছিল না। এখন পরিকল্পনা কমিশন যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটিই অনুসরণ করা হবে। বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো দেশও এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।

পিইসি সভায় প্রকল্পে জিপ ও মিনিবাস কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ বিষয়ে নিপোর্টের প্রতিনিধি জানান, ঢাকা ও ঢাকার বাইরের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে প্রশিক্ষণার্থীদের পরিবহনের জন্য এসব যানবাহন প্রয়োজন। পরে অর্থ বিভাগের মতামত নিয়ে এ খাতের প্রস্তাব পুনর্গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া ২০০টি এসি কেনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। জবাবে নিপোর্ট জানায়, দেশের ৩৫টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পর্যাপ্ত এসি নেই। অতিরিক্ত ফ্যানের শব্দ ও গরমের কারণে প্রশিক্ষণের পরিবেশ ব্যাহত হয়। তবে পরিকল্পনা কমিশন এসির সংখ্যা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণের নির্দেশ দিয়েছে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের প্রস্তাবকে সরাসরি দুর্নীতি বলা যায় না। তবে বিদেশে প্রশিক্ষণের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা জরুরি। তিনি বলেন, বাস্তবায়নের সময় অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম, অপচয় ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটে এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অর্জিত জ্ঞানও অনেক সময় কাজে লাগে না। তাই বিচার বিশ্লেষণ করেই এ ধরনের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া উচিত।



banner close
banner close