১২ জুলাই ২০২৪: শুক্রবার জুলাই আন্দোলনের দ্বাদশ দিনে স্পষ্ট হয়ে যায়, পুলিশি বাধা বা সংঘর্ষ আন্দোলন থামাতে পারছে না। আগের দিনের লাঠিচার্জ ও সংঘর্ষের প্রতিবাদে শুক্রবারও ছুটির দিন উপেক্ষা করে রাজপথে নামেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।
সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে ১২ জুলাই শুক্রবার পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
এর আগের দিন বাংলা ব্লকেড কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপে আহত হন বহু শিক্ষার্থী। সেই ঘটনার প্রতিবাদেই মূলত ১২ জুলাইয়ের কর্মসূচি পালিত হয়।
বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগে অবস্থান নেন। পরে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরাও সেখানে যোগ দেন। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখেন আন্দোলনকারীরা।
সমাবেশ শেষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার জানান, পরদিন ১৩ জুলাই দেশের ৬৪ জেলায় অনলাইন ও অফলাইনে প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। একইসঙ্গে সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি। এ সময় সরকারের কাছে এক দফা দাবি আমলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
শুধু শাহবাগ নয়, এদিন রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও চলতে থাকে বিক্ষোভ। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকেলে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন। কলাভবনের সামনে থেকে শুরু হওয়া মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে বাহাদুর শাহ পার্ক ও কবি নজরুল কলেজসংলগ্ন এলাকা প্রদক্ষিণ করে ক্যাম্পাসে ফিরে আসে। আর সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ধ্যায় বের হয় মশাল মিছিল।
এদিকে রাতে শাহবাগ থানায় পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করা হয়। রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের পরিবহন বিভাগের গাড়িচালক খলিলুর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলাটি করেন।
অন্যদিকে, রাজধানীর বাইরে অন্তত ১৫টি স্থানে কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে মানববন্ধন কর্মসূচিতে বাধা দেয় সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-রাজশাহী রেলপথ অবরোধ করেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও।
সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও মশাল মিছিল করেন। রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থান নিতে গেলে পুলিশ বাধা দেয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
আন্দোলন নিয়ে সরকারের বক্তব্যও আরও কঠোর হতে থাকে। তৎকালীন স্বৈরাচার সরকারের জনপ্রশাসনমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি এই আন্দোলনে ষড়যন্ত্র করছে। জনগণের জানমাল রক্ষায় আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুমকি দেন তিনি।
একই দিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও হাসিনার সরকারের অন্যতম স্বৈরাচার ওবায়দুল কাদেরও বলেন, কোটাবিরোধী আন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত শক্তি ভর করেছে।
এই অবস্থায় হাসিনার পালিত ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান বলেন, আদালতের প্রতি সবার শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত। কোটা আন্দোলনের নামে কেউ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটালে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৃষ্টির কারণে ১২ জুলাই শুক্রবারের কর্মসূচি কিছুটা বিলম্বে শুরু হলেও নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী শাহবাগে অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। সংঘর্ষের পরও আন্দোলন যে থামেনি, বরং আরও বিস্তৃত হচ্ছে—১২ জুলাইয়ের কর্মসূচি সেই বার্তাই দেয়।
আরও পড়ুন:








