শনিবার

১১ জুলাই, ২০২৬ ২৭ আষাঢ়, ১৪৩৩

ধেয়ে আসছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাপ, শেষের পথে জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০৩

শেয়ার

ধেয়ে আসছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চাপ, শেষের পথে জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশের জনসংখ্যা কাঠামো দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কর্মক্ষম বয়সে থাকায় দেশ জনমিতিক লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) ভোগের সুযোগ পাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এ সুযোগ আর বেশিদিন থাকবে না। প্রয়োজনীয় নীতি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে আগামী বছরগুলোতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে এবং অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হবে।

জনমিতিক লভ্যাংশ বলতে এমন একটি সময়কে বোঝায়, যখন একটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী (সাধারণত ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী) নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে। এ সময় কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে জনসংখ্যাগত রূপান্তরের (ডেমোগ্রাফিক ট্রানজিশন) গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের বাইরে থাকায় এ সম্ভাবনার পুরো সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ বিললাল হোসেন বলেন, জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা পেতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, এই সুযোগের একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে হাতছাড়া হয়েছে, তবে এখনো কিছু সময় রয়েছে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার।

গবেষণা ও বিভিন্ন জনমিতিক তথ্য অনুযায়ী, আশির দশকের পর বাংলাদেশ প্রথম জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ পায়। ন্যাশনাল ট্রান্সফার অ্যাকাউন্টসের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩৬ সালের মধ্যে এ সুযোগ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জনের সময় রয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর হার বাড়তে শুরু করবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের দিকে নির্ভরশীলতার হার সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছে পরে আবার ঊর্ধ্বমুখী হবে।

জনসংখ্যাবিদদের মতে, বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উচ্চ যুব বেকারত্ব, শিক্ষার মানের ঘাটতি, নারীদের কম শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ, মানবসম্পদ উন্নয়নে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট, অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং কম সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হার।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শ্লথ হবে, বেকারত্ব বাড়বে এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য, বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

অধ্যাপক মোহাম্মদ বিললাল হোসেনের মতে, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় এখন থেকেই আয়-নিরাপত্তা, বয়সবান্ধব অবকাঠামো, জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রবীণদের জন্য মানসম্মত সেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জনমিতিক পরিবর্তনকে সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের শীর্ষে রাখতে হবে, যাতে অবশিষ্ট জনমিতিক সুযোগ সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানো যায়।



banner close
banner close