জুলাই আন্দোলনের একাদশ দিনে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। টানা কয়েক দিনের অবরোধের পর এবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়ায় পুলিশ। রাজধানী থেকে বিভিন্ন জেলায় বাংলা ব্লকেড ঘিরে দিনভর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বানে বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) চতুর্থ দিনের মতো বাংলা ব্লকেড পালন করে শিক্ষার্থীরা।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বিকেল থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধের চেষ্টা করে আন্দোলনকারীরা। পুলিশ বাধা দিলে শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি, পরে সংঘর্ষ। বিভিন্ন স্থানে লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ। এতে অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে এমন কর্মসূচি সহ্য করা হবে না। ব্লকেডের নামে সড়কে নামলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়।
বৃষ্টির কারণে নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে রওনা হয় শিক্ষার্থীরা। এর আগেই শাহবাগে অবস্থান নেয় পুলিশ। ইন্টারকন্টিনেন্টালমুখী সড়কে বসানো হয় ব্যারিকেড। প্রস্তুত রাখা হয় জলকামান ও সাঁজোয়া যান।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, মিছিল শুরু হওয়ার পর পুলিশ তাদের জানিয়ে দেয়, ব্যারিকেড অতিক্রম করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে বিকেল পাঁচটার দিকে শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগ মেট্রো স্টেশনের নিচে অবস্থান নিলে পুলিশ পিছু হটে।
শাহবাগে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেন, পুলিশ দিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না, ভয় দেখিয়ে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না, হামলা করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না, কোটা না মেধা, মেধা মেধা এবং মুক্তিযুদ্ধের বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই।
রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ফটকের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়। অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের আটকে দেয়ার চেষ্টা করে প্রশাসন। পরে তালা ভেঙে মিছিল নিয়ে শাহবাগে যোগ দেয় তারা।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে।
রাজধানীর বাইরে সংঘর্ষের ঘটনাও বাড়তে থাকে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। তাদের মধ্যে নয়জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চট্টগ্রামে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। পরে শিক্ষার্থীরা নগরের ২ নম্বর গেটে গিয়ে সড়ক অবরোধ করে।
সিলেটে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করতে গেলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে কমপক্ষে পাঁচজন আহত হয়।
পুলিশি হামলার প্রতিবাদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা পরদিন শুক্রবার (১২ জুলাই) দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
একই দিনে রাজশাহী, বরিশাল, ইসলামী, খুলনা, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে কর্মসূচি পালন করে।
এদিন আন্দোলন নিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের বক্তব্যও আরও কঠোর হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অভিযোগ করেন, কোটা আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেয়ার চেষ্টা চলছে এবং বাংলা ব্লকেডের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ফেলা হচ্ছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের কাছে চিঠি পাঠায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগও দাবি করে, কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা চলছে।
তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার হুমকি দিয়ে বলেন, কেউ কেউ আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করছে। অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর বা জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হলে পুলিশ বসে থাকবে না।
এদিন ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে দেয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অংশও প্রকাশ করে হাইকোর্ট। সেখানে বলা হয়, সরকার চাইলে কোটার হার বা শতাংশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন কিংবা পরিমার্জন করতে পারবে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) সংঘর্ষে আন্দোলন নতুন এক বাস্তবতায় পৌঁছে যায়। পুলিশের বাধা, লাঠিচার্জ এবং দেশজুড়ে আহত শিক্ষার্থীদের ঘটনাকে সামনে রেখে আন্দোলনকারীরা পরদিন আরও বড় প্রতিবাদের ডাক দেয়। জুলাই আন্দোলন তখন রাজপথে আরও শক্তিশালী এক অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।
আরও পড়ুন:








