বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বানে সারাদেশে সর্বাত্মক বাংলা ব্লকেড পালিত হয়েছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। এতে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।
জুলাই আন্দোলনের দশম দিনে এই কর্মসূচি আরও কঠোর হয়। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর অন্তত ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবরোধ গড়ে তোলেন। শাহবাগ, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, ফার্মগেট, আগারগাঁও, শিক্ষা চত্বর, মৎস্য ভবন, চানখাঁরপুল ও বঙ্গবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় অবরোধ করা হয়।
শাহবাগে পৌঁছানোর আগে পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়েন শিক্ষার্থীরা। তবে ব্যারিকেড ভেঙে তারা নির্ধারিত স্থানে এগিয়ে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ ও শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের শিক্ষার্থীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে শাহবাগে সমাবেশ থেকে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া ঘোষণা দেন যে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে। তিনি ১১ জুলাই বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে আবারও সারাদেশে বাংলা ব্লকেড পালনের ঘোষণা দেন। পরদিন বিকেল সাড়ে তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে কর্মসূচি শুরু হবে বলে তিনি জানান।
ওইদিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের ওপর এক মাসের জন্য স্থিতাবস্থা দেয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। পরবর্তী শুনানির জন্য ৭ আগস্ট দিন নির্ধারণ করা হয়। রায়ের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান।
আদালতের এই আদেশের পরও আন্দোলনকারীরা রাজপথ ছাড়েননি। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রাজধানীর অন্তত ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে প্ল্যাকার্ড হাতে অবরোধ চালিয়ে যান তারা। কেন্দ্রীয়ভাবে শাহবাগে অবস্থান নিয়ে কর্মসূচি পালন করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। কর্মসূচি শেষে তারা সরকারি চাকরির সব গ্রেডে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ কোটা রেখে যৌক্তিক সংস্কারের মাধ্যমে আইন প্রণয়নের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বুধবার (১০ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে টানা চতুর্থ দিন ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ছাত্র ধর্মঘট পালন করেন শিক্ষার্থীরা। সকাল ১০টার আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন। পরে শাহবাগে গিয়ে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে অবরোধ গড়ে তোলেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম কলেজ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা গুলিস্তান জিরো পয়েন্ট ও পল্টন মোড়ে অবস্থান নেন। রাজধানীর বাইরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী কলেজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করেন।
তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আদালতের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থার আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনও আন্দোলন স্থগিতের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আপিল বিভাগের আদেশ অনুযায়ী ২০১৮ সালের পরিপত্রের ভিত্তিতে বর্তমান অবস্থা বহাল থাকবে। আন্দোলনকারীরা সরকার ও আদালতের আহ্বানে সাড়া দেননি। দিনভর সর্বাত্মক বাংলা ব্লকেড শেষে তারা ১১ জুলাইও একই কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।
আরও পড়ুন:








