ফ্যাসিস্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় আওয়ামী দালালখ্যাতরা লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এরা জুলাই ও প্রধানমন্ত্রীকে ব্যঙ্গ করছে। জুলাইবিরোধী ফ্যাসিস্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে দেশের ভেতর থেকেই ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ উঠেছে মিডিয়া জগতের ৮ শকুনখ্যাত দালালের বিরুদ্ধে। প্রতিনিয়ত যাদের হিংস্র থাবার শিকার হচ্ছে এ দেশের আপামর জনতার আবেগ, ভালোবাসা, চেতনা ও ভাবনা। যাদের লক্ষ্যই যেন জুলাই এবং জুলাইয়ের চেতনাকে তীরবিদ্ধ করা।
তাদের কথা ও লেখনীর তীক্ষ্ণ তীরে শহিদ ও শহিদ পরিবারের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ের জমাট বাঁধা রক্ত যেন আবারও ঝরে পড়ে; আর তাতে ক্ষতবিক্ষত হয় জুলাইয়ের স্পৃহা, চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। তাদের উপস্থাপনার অবমাননাকর শব্দে কালিমালিপ্ত হয় ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ম্লান হয়ে যায় জুলাইযোদ্ধা ও আহতদের রক্তের ত্যাগ।
পরিচয় অনুযায়ী, এদের মধ্যে কেউ সাংবাদিক, কেউ উপস্থাপক, কেউ মডেল, আবার কেউ অভিনেত্রী। অভিযোগ রয়েছে, একসময় ফ্যাসিস্টকন্যা শেখ হাসিনার আচলের নিচে থেকে তারা পুরো মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, কালের আবর্তে ফ্যাসিস্ট সম্রাজ্ঞী শেখ হাসিনার তথাকথিত অপরাজেয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটলেও রয়ে গেছে তার ছায়াতলে বেড়ে ওঠা সেই মুখোশধারী ভদ্রলোকেরা, ফ্যাসিবাদের নীরব দোসর হয়ে। যারা এখনও বাংলাদেশে বসে প্রকাশ্যে ফ্যাসিস্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে বলে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিকারে হামলা চালিয়েছিল, সেই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে ফেরাতে যারা মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে নেমেছে, তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন গোলাম মাওলা রনি, এমনটাই ধারণা করছেন দেশের সচেতন মহলের একাংশ।
কখনো তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সরাসরি কটাক্ষ করেন, কখনো তার সম্পদ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, আবার কখনো জুলাইকে ‘সিডিআই’ বলা মেহের আফরোজ শাওনের সাফাই গেয়ে জুলাইয়ের বিরুদ্ধেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার এসব কার্যকলাপ শুধু প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিই নয়, বরং দেশের নিরাপত্তারও হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সম্প্রতি, তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর নিয়ে কটাক্ষ করার অভিযোগ উঠেছে গোলাম মওলা রনির বিরুদ্ধে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ‘আমার বন্ধু মহা জাদু জানে’ এই গান ব্যবহার করে একটি ভিডিও পোস্ট করলে, সেটিকে ঘিরে রনি একটি টকশোতে মন্তব্য করেন, ‘জাদু মানে ফাঁকি, আর মহা জাদুকর মানে মহা ফাঁকিবাজি।’ অনেকেই মনে করেন, এই বক্তব্যের মাধ্যমে তারেক রহমানকে সরাসরি ‘ফাঁকিবাজ’ আখ্যা দিয়েছেন রনি।
এ ছাড়াও গোলাম মাওলা রনি তারেক রহমানের মালয়েশিয়ার সেই সফরকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরে টকশোতে বলেন, তারেক রহমান মালয়েশিয়ায় গেছে, কোনো কিছু তো হলোই না; উল্টো তাকে আদর করে, যত্ন করে গান বেঁধে এই কথা বলে দিল যে, বাংলাদেশের যেসব শ্রমিককে মালয়েশিয়া নিবে, দেশে সেসব শ্রমিকদের নির্যাতন করা হচ্ছে।
গোলাম মাওলা রনির এই মন্তব্যের পরপরই দেখা গেল তার বিপরীত চিত্র। দীর্ঘদিন পর, বাংলাদেশিদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে সিলেট সার্কিট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এই ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য আবারও উন্মুক্ত হয়েছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।
এদিকে, সমালোচনা রয়েছে, জুলাইকে ‘সিডিআই’ বলা মেহের আফরোজ শাওনের পক্ষপাতিত্ব করার চেষ্টাতেও কোনো কমতি রাখেননি গোলাম মওলা রনি। তিনি শাওনের কথাকে স্বাভাবিক বলে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। রনি বলেন, জুলাইয়ের সঙ্গে শাওনের ‘সিডিআই’ শব্দটি ব্যবহার নতুন কোনো শব্দ নয়। বহু মানুষ অহরহ গত এক-দেড় বছর ধরে এসব কথা বলে আসছে।
অপরদিকে, টেলিভিশনের এক টকশো অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে অকাট্য ভাষায় গালিগালাজ করতেও দেখা গেছে রনিকে। কারো বার্ষিক আয়ের বিষয় তুলে ধরে, হিসেব ঠিক নেই, এমন যুক্তিতে তাকে থাপড়ানোর কথা বলেন গোলাম মওলা। তার কথার সূত্র ধরে অনেকেরই দাবি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে আক্রমণাত্মক কথা বলেছেন রনি।
এছাড়া, এর আগে তিনি তারেক রহমানকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা বলে নেটিজেনদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এক ভিডিওতে দেখা যায়, শিশু মুক্তিযোদ্ধার তকমা দিয়ে বিদ্রুপ করেন রনি। তার এ বক্তব্য তারেক রহমানকে নিয়ে বিদ্রুপ বলেই ধারণা নেটিজেনদের।
এই অবস্থায়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে রনির রয়েছে গভীর যোগসূত্র। কেননা, যে কোনো সময় শেখ হাসিনা ফিরে আসতে পারেন, এমন মন্তব্য করতে প্রায়ই দেখা যায় রনিকে।
তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে একের পর এক কটুক্তি, জুলাই অবমাননাকারীদের পক্ষে কথা বলা এবং শেখ হাসিনার ফেরার বিষয়ে তার তীব্র কামনা—এসবকে সামনে রেখে সংশ্লিষ্টরা মনে করছে, গোলাম মওলা রনি আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নে দেশে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের মতে, ফ্যাসিবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে যারা নাম লিখিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম মেহের আফরোজ শাওন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সর্বমহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘জুলাই সিডিআই’ হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করা ওই পোস্ট মুহূর্তেই ভাইরাল হয় এবং সমালোচনার ঝড় তোলে।
তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েও অনুশোচনা না করে মেহের আফরোজ শাওন জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘ডিজাইন’ বলে মন্তব্য করেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার বক্তব্য শহিদ পরিবারকে নিয়ে নয়, বরং ‘জুলাই ডিজাইনকারীদের’ উদ্দেশে।
সাংবাদিকতার জগতে উপস্থাপিকা নবনিতা চৌধুরীও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে তাকে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। সম্প্রতি শাওনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, শাওন যদি ‘জুলাই সিডিআই’ লিখতে চান, তাহলে কেন লিখতে পারবেন না? এছাড়া, ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়েও এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, রাতে ভোট হওয়ার কোনো প্রমাণ কারও কাছে নেই, যা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, তার এসব বক্তব্য আওয়ামী লীগের পক্ষে তার শক্ত অবস্থান প্রমাণ করে।
একইভাবে, সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্নাও একাধিকবার বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে ২০২৫ সালে তার গ্রেপ্তারের ঘটনাও আলোচনার জন্ম দেয়। সম্প্রতি একটি টকশোতে তাকে কোটা আন্দোলন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়। যেখানে তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের কোটা থাকলে সমস্যা, অথচ এখন সব জায়গায় কোটা আছে।”
এছাড়া, দেশে বসেই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে যারা সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন, তাদের মধ্যে সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করছে বিশ্লেষকরা। তারা বলছে, বিভিন্ন সময়ে আনিস আলমগীরের বক্তব্যে আওয়ামী লীগের প্রতি স্পষ্ট সমর্থন এবং দলটিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে বর্তমান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী রবিউল আলমের সঙ্গে একটি টকশোতে তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষ নিয়ে তুমুল বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। ওই আলোচনায় রবিউল আলমকে উদ্দেশ করে বলেন, তিনি নির্বাচন করতে পারলে আওয়ামী লীগও তা করার অধিকার রাখে। তার এই মন্তব্যকে ঘিরে টকশোতে তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র উত্তেজনাকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
সেইসঙ্গে, বিভিন্ন সময়ে আনিস আলমগীরকে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখা যায়। এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে যারা কাছ থেকে দেখেনি, তারা জানে না, যে কোনো বিষয়ে তার অসাধারণ কথা বলার দক্ষতা রয়েছে।
পাশাপাশি, ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নিয়েও তিনি সমর্থনসূচক বক্তব্য দেন। সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শাপলা চত্বরে যে সমাবেশ ছিল, সেটিকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য যে অভিযান চালানো হয়েছিল, তা সচেতন নাগরিক সমাজের অনেকেই প্রশংসা করে। কারণ, সেদিন যদি তাদের সরানো না যেত, তাহলে ঢাকা শহরে বড় ধরনের তছনছ হতে পারত।
তারা ছাড়াও সাংবাদিক সোমা ইসলাম, শারমিন সুলতানাসহ আরও কয়েকজনকে নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তীব্র সমালোচনা। দেশে বসে সরাসরি ভারত ও আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করছে তারা, এমন যুক্তি তাদের।
সব মিলিয়ে সংশ্লিষ্টদের মতে, মিডিয়ার একটি অংশ এখনও ফ্যাসিস্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয়। তাদের বক্তব্য, উপস্থাপনা ও লেখনী-সবকিছুই যেন আওয়ামী লীগের অবস্থানকেই প্রভাবিত করে। যেখানে ফ্যাসিবাদের পক্ষপাতিত্ব এবং জুলুমকে শক্তিশালী করার অপচেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন:








