প্রয়োজনীয় জ্যেষ্ঠতা, দক্ষতা ও বিধিমালার সব শর্ত পূরণ করার পরও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের এক হাজারের বেশি কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও কাজের আগ্রহ কমে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো পদোন্নতি না হলে প্রশাসনের কার্যকারিতা ও ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে অতিরিক্ত সচিব পদে অন্তত ৩০০, যুগ্ম সচিব পদে প্রায় ৪৫০ এবং উপসচিব পদে প্রায় ৩০০ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। প্রশাসনের ভাষায় এ ধরনের কর্মকর্তাদের ‘লেফট আউট’ বলা হয়। তারা ইতোমধ্যে পদোন্নতি পুনর্বিবেচনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন। এছাড়া আট মাস থেকে এক বছর আগেই পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করা আরও প্রায় ৫০০ কর্মকর্তা অপেক্ষায় রয়েছেন।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বলেছেন, যোগ্য কর্মকর্তারা পদোন্নতি চাইবেন, সেটিই স্বাভাবিক। তিনি জানান, পদোন্নতির কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে শিগগিরই পদোন্নতি দেওয়া হবে।
সরকারি নীতিনির্ধারণী সূত্রে জানা গেছে, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব—এই তিন স্তরে পদোন্নতির জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শুরু করেছে। যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নিয়মিত হিসেবে বিসিএস ২১তম ব্যাচের প্রায় ১৭০ কর্মকর্তাকে বিবেচনা করা হচ্ছে, যারা গত বছরের নভেম্বরেই প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে বিসিএস ২০তম ব্যাচের বঞ্চিত প্রায় ১৮০ কর্মকর্তার বিষয়ও পর্যালোচনায় রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা মন্ত্রীদের একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অন্তত ৭০ কর্মকর্তাকে এবার বিবেচনায় না নেওয়ার কথা জানা গেছে।
অন্যদিকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির জন্য বিসিএস ২৫তম ব্যাচের অন্তত ২০৪ কর্মকর্তা গত বছরের অক্টোবরেই যোগ্যতা অর্জন করেছেন। এছাড়া বিসিএস ২৪তম ব্যাচের পদোন্নতিবঞ্চিত ১৮৩ কর্মকর্তার মধ্যে কয়েকজনকে এবারও বিবেচনায় না নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের একটি অংশ অতীতে জেলা প্রশাসক বা মন্ত্রীদের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিসিএস ৩১তম ব্যাচের ২৫২ কর্মকর্তা এবং বিধি অনুযায়ী অন্যান্য ক্যাডারের ২৫ শতাংশ কর্মকর্তাকে বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিসিএস ৩০তম ব্যাচের পদোন্নতিবঞ্চিত ৭৯ কর্মকর্তার মধ্যে প্রায় ৫০ জনের বিষয়ও পর্যালোচনায় রয়েছে।
সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত এ এইচ মোফাজ্জল করিম বলেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি না পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারেন এবং প্রয়োজন হলে আদালতেরও আশ্রয় নিতে পারেন। তিনি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর আগের সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা ন্যায়সংগত নয়, যদি না তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী বলেন, প্রশাসনে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে কনিষ্ঠদের পদোন্নতি দেওয়া উচিত নয়। কোনো কর্মকর্তাকে পদোন্নতি না দিলে তার কারণ স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন। তবে দলীয়করণে জড়িত বা অনিয়মে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন।
সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, সময়মতো পদোন্নতি না হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়, যা প্রশাসনিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সেবাও ব্যাহত হয়।
আরও পড়ুন:








