বুধবার

৮ জুলাই, ২০২৬ ২৪ আষাঢ়, ১৪৩৩

কারাগারে বাড়ছে মৃত্যু, নেপথ্যে চিকিৎসা সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ জুলাই, ২০২৬ ০৯:৪৭

শেয়ার

কারাগারে বাড়ছে মৃত্যু, নেপথ্যে চিকিৎসা সংকট
ছবি সংগৃহীত

দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনাও বাড়ছে। মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ, অ্যাম্বুলেন্স এবং জরুরি চিকিৎসাসেবার সংকটের কারণে গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে রাতের বেলায় চিকিৎসকের উপস্থিতি সীমিত থাকায় হৃদরোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্টসহ জরুরি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আক্রান্ত বন্দিদের চিকিৎসায় মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে ৬১ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪২। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বন্দি মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

অন্যদিকে, কারা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন কারাগারে ১৮৬ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯৭ জনে। তবে আসক ও কারা অধিদফতরের পরিসংখ্যানে পার্থক্য রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি ও আওতাভেদে এ ব্যবধান তৈরি হতে পারে।

মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, চিকিৎসক সংকট, অ্যাম্বুলেন্সের অপ্রতুলতা, উন্নত চিকিৎসার জন্য বন্দিদের দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকা এবং কারা হাসপাতালগুলোর সীমিত সক্ষমতা বন্দি মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি রোগী পরিবহনে ভাড়া করা যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে চিকিৎসা পেতে বিলম্ব হয় এবং রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে।

কারা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৪৬টি। তবে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। একই সঙ্গে ডিপ্লোমা নার্সেরও বড় ধরনের সংকট রয়েছে। ফলে বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য নিয়মিত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে দেশে ৬৮টি কারাগারের বিপরীতে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৩টি। ফলে অধিকাংশ কারাগারের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স নেই। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় এই সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, কারাগারে চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে রাতের বেলায় চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত সীমিত থাকায় গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের হাসপাতালে পাঠাতে বিলম্ব হয়। অ্যাম্বুলেন্স সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

তিনি আরও বলেন, কারাগারে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া গ্রেফতারের সময় নির্যাতনের শিকার কোনো ব্যক্তির যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত না হলে তার স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেড়ে যেতে পারে।

নূর খান লিটনের অভিযোগ, কারা চিকিৎসাকেন্দ্রে শয্যা সীমিত হওয়ায় প্রকৃত অসুস্থ বন্দিরা অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। অভিযোগ রয়েছে, অনিয়মের মাধ্যমে সুস্থ ব্যক্তিরাও কখনও কখনও চিকিৎসাকেন্দ্রের সুবিধা পেয়ে থাকেন। তিনি বন্দি মৃত্যুর ঘটনা কমাতে কারাবিধি সংস্কার, কারা হাসপাতালের আধুনিকায়ন, ২৪ ঘণ্টা জরুরি চিকিৎসাসেবা, গুরুতর রোগীকে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এ বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে বন্দিদের বাইরে হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

তিনি বলেন, চিকিৎসক ও ডিপ্লোমা নার্সের সংকট বাস্তবতা হলেও তা কাটিয়ে উঠতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দফতরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে। সম্প্রতি সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে ৫৫ জন ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগ পেয়েছেন। নিয়োগ-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে তারা দ্রুত কারা হাসপাতালগুলোতে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন।

অ্যাম্বুলেন্স সংকটের বিষয়টিও স্বীকার করে আইজি প্রিজনস জানান, বর্তমানে কারা অধিদফতরের ২৩টি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। তবে আরও ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ নিষ্পত্তি ও অনুমোদন শেষে ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু হবে। নতুন অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত হলে জরুরি রোগী পরিবহন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শুধু নতুন অ্যাম্বুলেন্স বা নার্স নিয়োগই যথেষ্ট নয়। কারাগারের চিকিৎসাব্যবস্থাকে একটি পূর্ণাঙ্গ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। তাদের মতে, ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক উপস্থিতি, জরুরি রোগী স্থানান্তরের নির্দিষ্ট সময়সীমা, পর্যাপ্ত ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা, রোগী ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং গ্রেফতারের পর বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা গেলে কারাগারে বন্দি মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।



banner close
banner close