বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকদের কাজ নিয়ে মন্তব্য করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী। স্বাধীনতার পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সুনাম ও সুখ্যাতির সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশি অভিবাসীরা। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশি অভিবাসীরা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কর্মদক্ষতা ও সুনামের সুবাস ছড়িয়ে আসছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় হাড়ভাঙা খাটুনি ও নিরলস পরিশ্রমের সময় যখন মাথার ঘাম কপাল বেয়ে চুয়ে পড়ে, তখন সেই ঘামের অর্থেই দেশের রাজনীতিবিদ, এমপি-মন্ত্রী ও সরকারি আমলারা গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে স্বস্তির ঢেকুর তোলেন।
কিন্তু এই পরিশ্রমের আড়ালে লুকিয়ে আছে প্রবাসীদের নানা নির্যাতন ও বঞ্চনার চিত্র। অনেক ক্ষেত্রে তারা শ্রম অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, সময়মতো বেতন পান না, অতিরিক্ত কাজ করানো হয় এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন।
অপরদিকে, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে থাকা প্রবাসীদের দুঃখ-কষ্ট যেন অর্থহীন হয়ে পড়ে। মা-বাবা, সন্তান ও পরিবার-পরিজন থেকে দীর্ঘ বিচ্ছেদ ঢাকা পড়ে যায় কিছু বেলাগাম মন্ত্রী-আমলাদের লাগামহীন কথাবার্তায়। এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরুর একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি দাবি করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে এআই ভিত্তিক নজরদারিতে দেখা গেছে যে, অনেক বাংলাদেশি কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি দেন, মোবাইলে ব্যস্ত থাকেন এবং খোসগল্পে সময় কাটান।
তাঁর এমন মন্তব্যের পরপরই শুরু হয় তীব্র বিতর্ক, আলোচনা ও সমালোচনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, তাঁর এই বক্তব্য প্রবাসীদের পরিশ্রমকে হেয় করে এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সকে খাটো করে দেখায়। বিদেশে থাকা প্রবাসীদের একাংশ অভিযোগ করেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি—আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি দক্ষ জনশক্তি বিদেশে পাঠানো—বাস্তবায়নে ব্যর্থতা আড়াল করতেই এ ধরনের মন্তব্য করা হয়েছে।
অপরদিকে প্রতিমন্ত্রীর এই কথার মাঝেই কিছু তথ্য সামনে এনেছেন অনেকে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ৩৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙেছে।
চলতি বছরে রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩৫ থেকে ৩৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই রেকর্ড ভাঙা রেমিট্যান্সই প্রমাণ করে প্রবাসীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগ। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য কি নিছকই বেখেয়ালি মন্তব্য, নাকি এর পেছনে রয়েছে অদক্ষতা ও অপরিপক্বতা?
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার পেছনে মূল কারণ অবৈধ অভিবাসন, মানবপাচার, আইন লঙ্ঘন এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বেপরোয়া সিন্ডিকেট।
এই এজেন্সি সিন্ডিকেটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশগামী শ্রমিকরা প্রতারিত হচ্ছেন। তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া, কাজ না দিয়ে বসিয়ে রাখা, কোম্পানি পরিবর্তন, বিমানবন্দরে হয়রানি—এসব অভিযোগ নিয়মিত শোনা যায়। অনেক ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয় না। একইসঙ্গে বিদেশে পৌঁছানোর পরও অনেক শ্রমিককে চুক্তিভঙ্গ, বেতন না দেওয়া বা জোরপূর্বক কাজ করানোর মতো নির্যাতনের মুখে পড়তে হয়।
তথ্য অনুসারে, ভারত থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যেতে খরচ হয় প্রায় দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল বা ভুটান থেকে এই খরচ এক থেকে দেড় লাখ টাকা। অথচ বাংলাদেশ থেকে একই গন্তব্যে যেতে খরচ হয় তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা। অনেক ক্ষেত্রে সর্বস্ব হারাতে হয় সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে।
বাংলাদেশে বিদেশে জনশক্তি পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াই মূলত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর নিয়ন্ত্রণে। মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে এর ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট। আওয়ামী লীগ আমলে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠানকে শ্রমিক পাঠানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। যদিও পরে আরও ১০১টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে ওই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বাইরে অন্যরা তেমন কোনো সুযোগ পাননি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্যান্য এজেন্সির মালিকরা নতুন আশার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
এদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারেও বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। গত পাঁচ বছরে ৪০ হাজার কোটার বিপরীতে গেছে মাত্র ১৫ হাজার কর্মী। ২০২৫ সালে নির্ধারিত ১০,৩০০ কোটার বিপরীতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেদেশে গেছে মাত্র ১,২৪৪ জন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জাপান টাইমস জানিয়েছে, ২০৪০ সালের মধ্যে জাপানে কর্মক্ষম জনসংখ্যার ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ বিপুল সংখ্যক দক্ষ কর্মী পাঠাতে পারে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর। তাই এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া এবং তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি, দ্রুত এজেন্সি সিন্ডিকেট ভেঙে বৈদেশিক শ্রমবাজারকে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু করা সময়ের দাবি।
আরও পড়ুন:








