দেশের প্রথম নদীতল টানেল কর্ণফুলী টানেল নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন দিগন্ত খুলে দেবে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি যোগ করবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু চালুর পর এটি আক্ষরিক অর্থেই শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়েছে।
আইএমইডির ২০২৬ সালের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হরিলুটের চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রত্যাশিত যানবাহন চলাচল না হওয়ায় টোল আদায় দিয়ে পরিচালন ব্যয়ই মেটানো যাচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে ১০ লাখ টাকা। নথিপত্রে অস্তিত্ব না থাকলেও ল্যান্ডস্কেপিং ও বাগানের নামে ৪৯ কোটি টাকা গায়েব করা হয়েছে। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় বাংলো নির্মাণে ৫০৩ কোটি টাকা ব্যয়, ঠিকাদারকে কয়েকশ কোটি টাকার অনৈতিক সুবিধা দেওয়া এবং ভুয়া বিলে অর্থ উত্তোলনসহ প্রকল্পটিতে অন্তত ৪৪টি গুরুতর অডিট আপত্তি ঝুলছে।
সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি প্রকৌশলগতভাবে সফল হলেও ব্যয় ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুতর অসংগতি পাওয়া গেছে। অনেক খাতে ব্যয়ের পর্যাপ্ত নথি নেই। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বিধি অনুসরণ না করেই অর্থ ছাড় করা হয়েছে।
ল্যান্ডস্কেপিং ও বৃক্ষরোপণ খাতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব কিংবা প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদনে এমন কোনো কাজের উল্লেখ নেই। কোথায় গাছ লাগানো হয়েছে, কতটুকু এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছে কিংবা কীভাবে এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর প্রকল্পের নথিপত্রে পাওয়া যায়নি। অডিট কর্তৃপক্ষ এ ব্যয়কে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
টানেলের জন্য ৫০৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে একটি সার্ভিস এরিয়া সংবলিত ৩০টি বাংলো। আইএমইডির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে এই স্থাপনার প্রয়োজনীয়তার যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায়নি। টানেলে যানবাহনের চাপ প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় এই সার্ভিস এরিয়ার ব্যবহারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
একটি বিদ্যমান বাংলো সংস্কারে ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকা। অডিট প্রতিবেদনে এত অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল্য সমন্বয়ের নামে বিধিবহির্ভূতভাবে ২২৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। একই ধরনের আরেকটি আপত্তিতে আরও ৪২ কোটি ২৬ লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে অর্থ ছাড় না করে প্রভিশনাল সাম থেকে অতিরিক্ত ৯০ কোটি ২৭ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই ৭৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকার ভেরিয়েশন অর্ডার জারি করা হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করলেও আদায় করা হয়নি বিলম্বজনিত জরিমানা। এতে এক ঘটনায় ২৪৯ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং আরেক ঘটনায় ২ কোটি ১১ লাখ টাকা লিকুইডেটেড ড্যামেজ থেকে সরকার বঞ্চিত হয়েছে। পৃথক সুপারভিশন পরামর্শক নিয়োগ থাকা সত্ত্বেও নির্মাণ তদারকির নামে অতিরিক্ত ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত অনুসরণ না করে পরামর্শককে আপ্যায়ন ব্যয় হিসেবে ১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
জাল বিল-ভাউচার ব্যবহার করে ৪১ লাখ ৯ হাজার টাকা সরকারি অর্থ উত্তোলনের তথ্য উঠে এসেছে। সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ না করে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই পুলিশ ও ফায়ার স্টেশন নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে ২১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও সরকারি গাড়ি ফেরত না দেওয়ায় ১৪ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং পৃথকভাবে আরও ৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার অডিট আপত্তি রয়েছে।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও অনিয়ম ধরা পড়েছে। পরামর্শকের বিল থেকে প্রয়োজনীয় আয়কর কম কাটার কারণে সরকারের ৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। উপ-ঠিকাদারের বিল থেকে ভ্যাট কম কাটার কারণে আরও ২ কোটি ৮৯ লাখ টাকার ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে।
প্রত্যাশিত যানবাহন না থাকায় টোল থেকে যে আয় হচ্ছে, তা পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৫৪ থেকে ৫৫ শতাংশ মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। প্রতিদিন খরচ হচ্ছে ২২ লাখ টাকা। টোল আদায় হচ্ছে মাত্র ১২ লাখ টাকা। বছরে ৩৬ কোটি টাকার বেশি লোকসান হচ্ছে। সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায় প্রতিদিন গড়ে ১৭ হাজার ৩৭৫টি যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও বাস্তবে চলাচল করছে মাত্র ৪ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার যানবাহন।
আইএমইডি অব্যবহৃত সার্ভিস এরিয়াটি তৃতীয় পক্ষের কাছে ইজারা দেওয়া, ইলেকট্রনিক টোল সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু করা এবং টানেলের ব্যবহার বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে। ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ এবং আগের বিভিন্ন অর্থবছরের মোট ৪৪টি অডিট আপত্তি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
প্রকল্পের সর্বশেষ পরিচালক হারুনুর রশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেছেন, লোকসান ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার আগে দৈনিক লোকসানের পরিমাণ আরও বেশি ছিল। প্রকল্পের সঙ্গে যেসব উন্নয়নকাজ হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোর অনেকই হয়নি। বর্তমানে এসব কাজ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আনার চেষ্টা চলছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বাড়লে যানবাহনের চলাচল বাড়বে। অডিট আপত্তির বিষয়গুলো নিয়ম অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হবে।
পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন আল রশিদ বলেছেন, এটি একটি অদূরদর্শী প্রকল্প। সময়ের আগেই এটি নেওয়া হয়েছে। যেসব ফিডব্যাকের কথা বিবেচনা করে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর এখনো সময় হয়নি।
প্রকল্পটির আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অডিট আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির প্রয়োজন বলে মনে করছে আইএমইডি। টানেলের দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা নির্ভর করছে সমন্বিত উন্নয়ন ও ব্যবহার বৃদ্ধির উপর।
আরও পড়ুন:








