পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ওপর প্রকাশিত সাম্প্রতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুতর দুর্বলতার প্রমাণ মিলেছে।
১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই মেগাপ্রকল্পে গত তিন অর্থবছরে ৬৮টি অডিট আপত্তি অনিষ্পন্ন রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি ‘গুরুতর আর্থিক অনিয়ম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইএমইডির মতে, এসব আপত্তি নিষ্পত্তি না হওয়ায় সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে ল্যান্ডস্কেপিং ও গাছ লাগানোর জন্য ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) কিংবা প্রকল্পের চূড়ান্ত প্রতিবেদন (পিসিসিআর)-এ এ ধরনের কাজের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এছাড়া ৫০৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি ‘সার্ভিস এরিয়া’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। সংস্থাটির মতে, টানেলের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে এ অবকাঠামোর সরাসরি সম্পর্ক নেই। সেখানে বাংলো, মোটেল, কনভেনশন সেন্টার, চিকিৎসাকেন্দ্র ও জাদুঘর নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর সঙ্গে টানেলের সরাসরি সড়ক সংযোগ নেই। এ ব্যয়কে আইএমইডি ‘অপ্রয়োজনীয়’ এবং ‘নীতিগত অনিয়ম’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জেনারেল ফ্যাসিলিটিজ তহবিলে একই ধরনের ব্যয়ের ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কন্টিনজেন্সি তহবিল থেকে ২২৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এছাড়া ২২৪ কোটি টাকার অননুমোদিত মূল্য সমন্বয়, আলাদা পরামর্শক নিয়োগের পরও ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত সুপারভিশন ফি প্রদান এবং বরাদ্দের বাইরে আরও ৯০ কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। আইএমইডির মতে, সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন ও চুক্তির শর্ত ভঙ্গের কারণেই এসব অনিয়ম ঘটেছে।
প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বৃদ্ধি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। একনেক ২০১৫ সালের নভেম্বরে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির অনুমোদন দিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৪২ লাখ টাকায়, যা প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয়ের তুলনায় ২৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে প্রকল্পের বাস্তবায়নকালও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
প্রশাসনিক ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। প্রকল্পের আওতায় কেনা ২৯টি গাড়ির মধ্যে মাত্র ৬টি বাংলাদেশ সেতু বিভাগকে হস্তান্তর করা হয়েছে, আর বাকি ২৩টি এখনও অব্যবহৃত রয়েছে। এছাড়া সরকারি নিয়ম অনুযায়ী সার্বক্ষণিক ও অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকলেও প্রকল্প চলাকালে চারজন পরিচালক দায়িত্ব পালন করেন। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে দুই বছর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে আইএমইডি।
প্রতিবেদনে টানেলের আর্থিক কার্যকারিতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলাচলের পূর্বাভাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উদ্বোধনের পর প্রথম কয়েক মাসে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার যানবাহন চলাচল করলেও ২০২৬ সালের শুরুর দিকে তা নেমে আসে ৩ হাজার ৪২২ থেকে ৩ হাজার ৪৮৮টিতে। বর্তমানে প্রতিদিন মাত্র ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার হালকা যানবাহন টানেল ব্যবহার করছে, যা পূর্বাভাসের প্রায় ১৪ শতাংশ। অধিকাংশ ভারী পণ্যবাহী যানবাহনও এ পথ ব্যবহার করছে না।
আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, টানেলের দৈনিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ২২ লাখ টাকা ব্যয় হলেও টোল থেকে আয় হচ্ছে প্রায় ১২ লাখ টাকা। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং এ ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পটি ২০১৫ সালে একনেকের অনুমোদন পায়। প্রকল্পের অর্থায়নে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক ৫ হাজার ৯১৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা ঋণ দেয়, যা ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরে পরিশোধের শর্তে গ্রহণ করা হয়।
আরও পড়ুন:








