রাজধানী ঢাকার আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে অলিগলিতে মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। মায়ানমারভিত্তিক ইয়াবা ট্যাবলেটের পাশাপাশি আইস, হিরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিল, সিসা ও এলএসডির মতো মারাত্মক মাদক এখন সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চিহ্নিত স্পট ছাপিয়ে অপরাধীরা এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা চালাচ্ছে। অভিনব সব কৌশলে মাদক পাচার ও বিক্রি চললেও প্রভাবশালী মহলের মদদ এবং কার্যকর সামাজিক আন্দোলনের অভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক অভিযানে গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাতে রাজধানীর ভাটারা এলাকা থেকে ৬৬ কেজি সিসাসহ ইরানি বংশোদ্ভূত দুই ভাইসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই দিনে টেকনাফ সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ২ কেজি ক্রিস্টাল মেথ বা আইস এবং একটি রাইফেল জব্দ করা হয়। এর আগে গত বুধবার (১ জুলাই) শাহপরীর দ্বীপে ২ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ দুজনকে আটক করে বিজিবি। এছাড়া গত শুক্রবার (৩ জুলাই) ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিট পাকস্থলীর ভেতরে ইয়াবা পাচারকালে দুজনকে গ্রেপ্তার করে। অপরাধীরা বর্তমানে মোবাইল ফোনের ব্যাটারির ভেতরে বা বিভিন্ন পণ্যের আড়ালে মাদক বহন করছে।
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ঢাকা মহানগরের আটটি ক্রাইম জোনে বর্তমানে ২৪৭টি সক্রিয় মাদক স্পট রয়েছে। এসব স্পটের নেপথ্যে অন্তত ২৩১ জন ডিলার এবং ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি মাদক কারবারি জড়িত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার চারপাশের ১০৫টি রুট দিয়ে প্রতিদিন ইয়াবা, আইস ও হিরোইনের মতো মাদক প্রবেশ করছে। বাড্ডার মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজার এলাকা এবং সায়েদাবাদ জনপদের মোড় সংলগ্ন রিকশা গ্যারেজ বর্তমানে মাদকের নতুন হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের নাকের ডগায় এসব কারবার চললেও রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
রাজধানীর সবচেয়ে কুখ্যাত তিনটি মাদকের হাট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, কারওয়ান বাজার থেকে নাখালপাড়া পর্যন্ত রেললাইন এলাকা এবং মিরপুর বিহারি ক্যাম্প। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পকে মাদকের প্রধান ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে অভিহিত করা হয় যেখানে নারী ও শিশুদের ব্যবহার করে মাদক বিক্রি চলে। অন্যদিকে কারওয়ান বাজার রেললাইন এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই ভাসমান বিক্রেতাদের মাধ্যমে মাদক কেনাবেচা হয়। মিরপুরের ঘনবসতিপূর্ণ বিহারি ক্যাম্পগুলোতে অপরাধীরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে সহজেই আত্মগোপন করতে পারে।
মাদকের এই ভয়াবহ বিস্তার প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক গত শুক্রবার (৩ জুলাই) জানান যে মাদকের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী ও উচ্চপর্যায়ের। সীমান্ত এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা মাদক কারবারে মদদ দিচ্ছেন। তিনি মনে করেন, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহায়তার কারণেই মাদক চোরাচালান বন্ধ হচ্ছে না। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকির পাশাপাশি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক গত শুক্রবার (৩ জুলাই) বলেন যে মাদক দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং অপরাধীদের মনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভয় হ্রাস পাওয়াকে তিনি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেন। তিনি দ্রুত মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কঠোর অবস্থান দৃশ্যমান করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান যে মাদকের বিরুদ্ধে ডিএমপির নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে। তবে কেবল অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন যে মাদক নিয়ন্ত্রণে সবার আগে সীমান্ত সিল করা বা বন্ধ করা প্রয়োজন। সীমান্তে টহল বৃদ্ধির পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে তিনি সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানান।
আরও পড়ুন:








