৫ জুলাই, ২০২৪: স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ জুলাই ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এদিন পঞ্চম দিনে পদার্পণ করে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও আন্দোলনের তীব্রতা না কমে বরং তা দেশব্যাপী এক সমন্বিত ছাত্রজাগরণে রূপ নিতে শুরু করে।
ছুটির দিনেও স্থবির রাজপথ
শুক্রবার সরকারি ছুটির দিনে সাধারণত ক্যাম্পাস ও রাজপথ শান্ত থাকলেও সেদিন চিত্র ছিল ভিন্ন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সকাল থেকেই অবস্থান নিতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। অনলাইন ও অফলাইনে সমন্বিত প্রচারণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং সড়ক অবরোধের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বে না।
ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক ও হলের উত্তেজনা
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে দিনব্যাপী কর্মসূচি শেষে সমন্বয়করা এক নতুন ও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তারা আগামী ৭ জুলাই থেকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের জোরালো আহ্বান জানান।
এদিকে, আন্দোলনের গতি দমাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল থেকে সমন্বয়কদের বের করে দেওয়ার ঘোষণা দেয় ছাত্রলীগ। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। গভীর রাতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের অভ্যন্তরে শিক্ষার্থীরা স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলে ক্যাম্পাস, যা আন্দোলনের নতুন মাত্রা যোগ করে।
শিক্ষকদের প্রকাশ্য সমর্থন
৫ জুলাই আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপি ও জামায়াতপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর প্রকাশ্য সমর্থন। সংগঠনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান, যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান খান এবং অধ্যাপক আবদুস সালাম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। শিক্ষকদের এই সমর্থন শিক্ষার্থীদের নৈতিক বল আরও বাড়িয়ে দেয়।
সারা দেশে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন
৫ জুলাইয়ের আন্দোলন কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক ছিল না। ঢাকার সাত কলেজ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও আন্দোলনের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। এদিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (দিনাজপুর), যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন।
আন্দোলনের রূপান্তর
৫ জুলাইয়ের ঘটনাবলি প্রমাণ করে যে, কোটা সংস্কার আন্দোলন আর কোনো নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসের সীমাবদ্ধ কর্মসূচি নয়, বরং এটি একটি জাতীয় ছাত্র আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। ছুটির দিনেও শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং রাজপথে অবস্থানের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের যে দৃঢ়তা দেখা গেছে, তা পরবর্তী দিনগুলোতে এক বৃহত্তর গণবিস্ফোরণের পটভূমি তৈরি করে। ৭ জুলাই থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা মূলত চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে।
আরও পড়ুন:








