সাদা পতাকায় লেখা কালেমা তায়্যিবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’। মুসলমানদের কাছে এটি কেবল একটি বাক্য নয়, বরং জীবন ও বিশ্বাসের মূল ভিত্তি। কিন্তু সম্প্রতি এই কালেমা খচিত সাদামাটা পতাকাকে ঘিরে শুরু হয়েছে এক নজিরবিহীন প্রোপাগান্ডা।
বিশ্বাসের চূড়ান্ত প্রতীক কালেমা। কিন্তু এই কালেমা লেখা সাদা পতাকাই এখন প্রতিবেশী দেশ ভারতের গণমাধ্যম এবং তাদের কাছে নতুন আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে।
বিশ্বকাপ ফুটবল উন্মাদনার মাঝে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভিনদেশি পতাকার পাশাপাশি কালেমা খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ ও ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ওড়ানো এই কালেমা খচিত পতাকাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মিডিয়া শুরু করেছে জঘন্য এক মনস্তাত্ত্বিক খেলা। তাদের সংবাদমাধ্যমগুলোতে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে যে, এই পতাকা ওড়ানো মানেই বাংলাদেশে আইএসআই-এর মতো উগ্রবাদের নতুন উত্থান।
জনপ্রিয় অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের দাবি, এই প্রোপাগান্ডায় সরাসরি যুক্ত হয়েছে বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টারের মতো গণমাধ্যমগুলো। তিনি জানান, ভারত পরিচালিত প্রথম আলো সরাসরি সুবিধা করতে না পেরে এখন রয়টার্স, ডয়চে ভেলে এবং দেশীয় কিছু মিডিয়াকে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহার করে এই ‘জঙ্গিবাদের উত্থানের’ কাল্পনিক চিত্রনাট্য ছড়াচ্ছে।
এই সাংবাদিক আরও বলেন, তাদের মূল এজেন্ডা একটিই— সারা দুনিয়াকে এটা বোঝানো যে, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিশাল উত্থান হয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে টেনে আনা হয়েছে মাওলানা হারুন ইজহারকেও। তার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তাকে জঙ্গি নেতা সাজানোর চেষ্টা চলছে। মূলত বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা নিয়ে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অন্য দেশের পতাকার চেয়ে কালেমার পতাকা থাকাটা বেশি যৌক্তিক। এখানে কোনো সুদূরপ্রসারী জঙ্গি উদ্দেশ্য বা নির্দিষ্ট কোনো রঙের পতাকার কথা বলা হয়নি।
এই নিছক সাধারণ একটি মন্তব্যকে পুঁজি করে তাকেই এখন জঙ্গি নেতা বানানোর অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকেই বলছেন, এর উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। বহির্বিশ্ব এবং বিশেষ করে ভারতীয় মিডিয়ার কাছে সুকৌশলে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়া যে, বাংলাদেশে পট পরিবর্তনের পর এখন কেবল জঙ্গিবাদের আখড়া তৈরি হচ্ছে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন মনে করিয়ে দেন, দেশে জঙ্গি নাটক সাজানোর এই খেলা নতুন নয়। ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার সময়ও একই রকম গোয়েন্দা চাল চালা হয়েছিল। সেসময় দেশীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করার পরও তৎকালীন সরকার সঠিক ব্যবস্থা নেয়নি।
হাসিনা সরকার ও ভারতের মিডিয়া, প্রথম আলো, জজ মিয়া নাটক কিংবা জঙ্গি নাটক সাজিয়ে সেদিন যেভাবে বিএনপিকে কোণঠাসা করেছিল, বর্তমানেও তারেক রহমান এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে সেই একই ফাঁদ পাতা হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
পশ্চিমা বিশ্ব যদি এই মিডিয়া প্রোপাগান্ডায় বিশ্বাস করে বাংলাদেশকে ‘জঙ্গি রাষ্ট্র’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তবে আগামী ১০০ বছরেও এদেশের মানুষ আলোর মুখ দেখবে না বলে সরকারকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এই অনুসন্ধানী সাংবাদিক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরো নাটকটির লক্ষ্য জঙ্গিবাদ দমন নয়, বরং মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতি ছড়ানো। তবে এর ফাঁদে যেন সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং আলেম সমাজ পা না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। অতি উৎসাহী হয়ে এমন কোনো কাজ করা উচিত হবে না, যা পশ্চিমা বিশ্বের কাছে বাংলাদেশকে একটি ‘জঙ্গি রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রমাণের সুযোগ করে দেয়।
কালেমা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা উগ্রবাদী দলের সম্পত্তি নয়। এটি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ের স্পন্দন। তাই কালেমাকে জঙ্গিবাদের মোড়কে বন্দি করার এই হীন অপচেষ্টা কেবল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতই নয়, বরং চরম উসকানিমূলক। মিথ্যা প্রচারণার এই তাসের ঘর যে খুব বেশিদিন টিকবে না, তা আজ সাধারণ মানুষের সচেতনতাতেই সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট।
আরও পড়ুন:








