শুক্রবার

৩ জুলাই, ২০২৬ ১৯ আষাঢ়, ১৪৩৩

সাংবাদিকতার আড়ালে আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়ন সোমা ইসলামের

রাকিব ইদ্রিস বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৩ জুলাই, ২০২৬ ২১:২৮

শেয়ার

সাংবাদিকতার আড়ালে আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়ন সোমা ইসলামের
ছবি সংগৃহীত

ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে মাঠে নেমেছেন সোমা ইসলাম। সোমা ইসলামকে নিয়ে বিতর্ক চলছে। জুলাই আন্দোলনকে খাটো করার অভিযোগ উঠেছে সাংবাদিক সোমা ইসলামের বিরুদ্ধে।

ফ্যাসিস্ট আমলে তোষামোদ করে নিজেদের পকেট ভারী করতে অনেক সাংবাদিককে আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন সময় মাত্রাতিরিক্ত তৈলবাজি করতে দেখা গেছে। চাটুকারিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, অনেক সাংবাদিককে দেখে মনে হতো তারা সাংবাদিক নন; যেন তারা ফ্যাসিস্ট সম্রাজ্ঞী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ব্লগার।

হাসিনা পতনের পর সেই চাটুকারিতানির্ভর সাংবাদিকতা দীর্ঘদিন দেখা না গেলেও অনেকের মতে, সেই অপসাংবাদিকতা আবারও নতুন করে দেশের মাটিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করেছে।

যে জুলাই এ দেশের মানুষকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখিয়েছে, দেখিয়েছে হাজারো তরুণকে এক নতুন স্বপ্ন, গড়ে তুলেছে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, বাধ্য করেছে ফ্যাসিস্ট সরকারকে পালিয়ে যেতে, সেই জুলাইকেই আজ সাংবাদিকের আড়ালে থাকা কিছু ফ্যাসিস্টের দোসর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খাটো করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রাজনৈতিক মহলের একাংশের।

গত কয়েক দিন ধরে জুলাই আন্দোলনকে উদ্দেশ্য করে উপস্থাপিকা সোমা ইসলামের বিভিন্ন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্ন ও বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে এসেছে। সেখানে সাংবাদিক সোমাকে জুলাই আন্দোলনকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও খাটো করে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। এতে তাকে নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।

অন্যদিকে, সম্প্রতি জুলাইকে নিয়ে বিএনপি নেত্রী নিলুফার চৌধুরীর এক বক্তব্য ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে নানা বিতর্ক। সেখানে তিনি জুলাই আন্দোলনকে একটি ডিজাইন বলে উল্লেখ করেন। জুলাই আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কারা মারলো, কেউ জানে না। সামনে কোনো পুলিশও ছিল না। পুলিশের গুলি হলে তো সামনেই হতো। হতে পারে কোনো বাসা থেকে টার্গেট করে, ওপরতলা থেকে টার্গেট করে হয়তো গুলি করা হয়েছে। তার নিজের কাছেও অনেক প্রশ্নের উত্তর নেই বলেই মন্তব্য করেন তিনি।

জুলাইকে খাটো করে এ ধরনের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই তৈরি হয় নেটিজেনদের ক্ষোভ। নেটদুনিয়ার পাশাপাশি এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয় নানা বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নিলুফার চৌধুরীর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব। তিনি লেখেন, টেলিভিশন টকশোতে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নিয়ে নিলুফার অযাচিত বক্তব্যে তারা অত্যন্ত মর্মাহত এবং ক্ষুব্ধ। লেখায়, বিএনপি নেত্রীর ওই বক্তব্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করার কথাও জানান রাকিব।

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাইকে নিয়ে নিলুফার চৌধুরীর এ ধরনের অযাচিত বক্তব্যের পেছনে সাংবাদিক সোমা ইসলামের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উপস্থাপনা ও উদ্ভট প্রশ্ন তাকে এমন মন্তব্য করতে প্ররোচিত করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিক সোমা ইসলাম ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসন করতে শক্তভাবে মাঠে নেমেছেন। বলা হচ্ছে, ৫ আগস্টের পর দীর্ঘদিন তাকে দেখা যায়নি। তবে সম্প্রতি তাকে আবারও চ্যানেল আইয়ের টকশো টু দ্য পয়েন্টে উপস্থাপকের ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ছলে-বলে-কৌশলে অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের কাছ থেকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে এবং ফ্যাসিবাদের পক্ষে বয়ান তৈরি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার বাংলাদেশি সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, সোমা ইসলাম গত ১৫ জুন ২০২৬ ইন্ডিগো এয়ারের একটি ফ্লাইটে কলকাতায় গিয়েছিলেন। সেখানে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। পাঁচ দিন অবস্থান শেষে ২০ জুন ২০২৬ বিকেলে একই বিমান সংস্থার ফ্লাইটে কলকাতা থেকে ঢাকায় ফেরেন। তিনি আরও বলেন, সোমা ইসলাম কাদের সহযোগী, সেটা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়ার প্রয়োজন নেই।

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবিরও নিলুফার চৌধুরীর বক্তব্যকে মূর্খতা আখ্যা দিয়ে তার ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লেখেন, জুলাইয়ের প্রথম দিনেই বিএনপি নেত্রীর মূর্খতার সুযোগে জুলাইকে ডিজাইন, ষড়যন্ত্র বললো হাসিনার গৃহকর্মী সোমা ইসলাম। এই জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকেই চ্যানেল আইকে বর্জন করার ঘোষণা দেন তিনি। সোমা ইসলামকে ফ্যাসিস্ট উল্লেখ করে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার আরও বলেন, সোমা একজন আত্মস্বীকৃত ফ্যাসিস্ট। চ্যানেল আইয়ের ফরিদুর রেজা সাগর ও শাইখ সিরাজ, দুই কালচারাল ফ্যাসিস্ট। বিএনপির নিলুফার চৌধুরী মনি সরাসরি আওয়ামী লীগের ন্যারেটিভ প্রচার করেছেন। এছাড়া, সরকারের দায়িত্বরতদেরও সমালোচনা করেন শাহরিয়ার কবির, সোমা ইসলামকে আবারও চ্যানেল আইয়ে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে চ্যানেল আইয়ের টকশো টু দ্য পয়েন্টে বিভিন্ন সময় বিএনপি ও চারদলীয় জোটের নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে, সাংবাদিক সোমা ইসলাম তাদের গলায় লাঞ্ছনার বেড়ি পরিয়েছেন, এমন অভিযোগও রয়েছে। বর্তমান সড়ক ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে টু দ্য পয়েন্ট টকশোতে এনে তার সঙ্গে বিভিন্ন অসৌজন্যমূলক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করতেও দেখা যায়। এতে বিব্রত হয়ে শেখ রবিউল আলম টকশো ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন।

এ ছাড়াও একটি ভিডিওতে দেখা যায়, ভারতের পক্ষে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ভারতঘেঁষা সম্পর্ককে তিনি স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন। অনুষ্ঠানে আগত এক অতিথিকে তিনি প্রশ্ন করেন, গ্লোবাল পলিটিক্সে একটি রাজনৈতিক দল ও একটি দেশ কীভাবে ভারতকে বাদ দিয়ে থাকতে পারে।

অনেকের মতে, সোমা ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে দেশে এসেছেন। সাংবাদিকতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিস্টদের দোসর বলেও অনেকে তাকে আখ্যায়িত করছেন।



banner close
banner close