বৃহস্পতিবার

২ জুলাই, ২০২৬ ১৭ আষাঢ়, ১৪৩৩

তিস্তা কেন্দ্রিক নতুন ভূ-রাজনীতি: বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতা

আতিফ রাসেল, বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১ জুলাই, ২০২৬ ১৬:০২

আপডেট: ১ জুলাই, ২০২৬ ২৩:০৮

শেয়ার

তিস্তা কেন্দ্রিক নতুন ভূ-রাজনীতি: বাংলাদেশ-চীন ঘনিষ্ঠতা
ছবি সংগৃহীত

৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্র উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। ভারতের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরশীলতা কমিয়ে ঢাকা এখন তার অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষায় নতুন মিত্র খুঁজে নিয়েছে। এই নতুন সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তিস্তা নদী। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা তিস্তা সমস্যার সমাধানে চীন এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়।

দেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও পানি সংকট নিরসনে জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বিষয়ে বর্তমান সরকার ইতিমধ্যে প্রশংসা অর্জন করছে।

তিস্তা নদী সিকিমের হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রাণস্বরূপ। সমস্যা শুরু হয় গত শতাব্দীর সত্তর দশকের শেষভাগে। ভারত গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর থেকে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ক্রমাগত মরুময়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। ১৯৮৩ সালে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি হলেও পূর্ণাঙ্গ পানি বণ্টন চুক্তি এখনো অধরা রয়েছে। দিল্লি পশ্চিমবঙ্গের অজুহাত দেখিয়ে চুক্তিটি দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রেখেছে। তিস্তা শুধু একটি নদী নয়, এটি বাংলাদেশের মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত ঐতিহাসিক বঞ্চনার প্রতীক।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাংলাদেশ সরকারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এ নদীকে ঘিরে ১৬টি জেলার প্রায় আড়াই কোটি মানুষ জীবনধারণ করে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় এক লাখ হেক্টর জমি নতুন করে সেচের আওতায় আসবে। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত হলে ধান গম ও শাকসবজির উৎপাদন বহুগুণ বাড়বে। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে অঞ্চলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আসবে, মরুকরণ প্রক্রিয়া কমবে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্থিতিশীল থাকবে এবং আর্সেনিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। নদীর নাব্য ফিরে এলে অভ্যন্তরীণ নৌবাণিজ্য ও মৎস্য চাষে বিপ্লব ঘটবে।

এ মহাপরিকল্পনার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১০ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এটি বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতের অন্যতম বড় প্রকল্প।

তিস্তা ব্যারেজ পরিকল্পনায় নদীর দুই পাড়ে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ, পানির ধারণক্ষমতা বাড়াতে নদী খনন এবং জলাধার তৈরির ব্যবস্থা রয়েছে। এটি কেবল নদী খনন নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইকোসিস্টেম।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে বাণিজ্য বিনিয়োগ শিক্ষা স্বাস্থ্যসহ ১৩টি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ ও চীন। এর মধ্যে তিস্তা প্রকল্প অন্যতম। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় নদীকেন্দ্রিক উন্নয়নে সর্বোচ্চ কারিগরি দক্ষতা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন কারণ এটি শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেনস নেকের কাছাকাছি। মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এ সরু পথ ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তরপূর্বের সাত রাজ্যের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। চীনের উপস্থিতি এ করিডোরের নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত এতদিন পানি আটকে রেখে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে, কিন্তু এখন তিস্তা তাদের জন্যও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

প্রতিরক্ষা খাতেও চীনের সহযোগিতা বাড়ছে। বাংলাদেশ চীনের তৈরি ২৪টি অত্যাধুনিক জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ হবে দ্বিতীয় বিদেশি ব্যবহারকারী। টু প্লাস টু সংলাপের মাধ্যমে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত আলোচনার সমঝোতা হয়েছে। চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে।

ভারত দীর্ঘদিন চিকিৎসা বাণিজ্যকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। চীন সফরের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে সমঝোতা হয়েছে যা ভারতের মেডিকেল ট্যুরিজমের ওপর প্রভাব ফেলবে। ইউনান প্রদেশে বিশ্বমানের চিকিৎসা সুবিধা এখন বাংলাদেশিদের নাগালে।

মংলা বন্দরের উন্নয়নেও চীনের ভূমিকা বাড়ছে। প্রস্তাবিত বাংলাদেশ মিয়ানমার চীন ইকোনমিক করিডোর বাংলাদেশকে পূর্ব এশিয়ার বাজারের সঙ্গে যুক্ত করবে। এটি ভারতের ট্রানজিট নীতির বিকল্প হিসেবে কাজ করবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মিয়ানমারের জান্তা ও আরাকান আর্মির সঙ্গে চীনের সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত বৈঠক দুই দেশের মধ্যে চুক্তির চেয়েও দক্ষিণ এশিয়ার আগামী কয়েক দশকের ক্ষমতার ভারসাম্যের নতুন রূপরেখা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন নিজের শর্তে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ভারত সম্প্রতি ট্যুরিস্ট ভিসা পুনরায় চালু করেছে।

এ দেশের বাতাস এখন বলছে সবকিছুর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশই নেবে। বাংলাদেশ আর দাবার ঘুঁটি নয়, বরং খেলার অন্যতম খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে।



banner close
banner close